
রান্নার স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়াতে রসুনের ব্যবহার বহুল প্রচলিত। তবে শুধু মসলা হিসেবেই নয়, এর রয়েছে বেশ কিছু সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ। রসুনে থাকা সালফারযুক্ত যৌগ নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এসব উপাদান রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপরও রসুনের কিছু ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে।
রসুনের সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারিতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এর সালফারযুক্ত যৌগ। রসুনের কোয়া কাটলে, থেঁতো করলে বা চিবালে এসব যৌগ তৈরি হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত অ্যালিসিন। তবে অ্যালিসিন অস্থিতিশীল হওয়ায় তাজা রসুন কাটার বা থেঁতো করার পর অল্প সময়ের জন্য এটি সক্রিয় অবস্থায় থাকে। ডায়ালিল ডিসালফাইড ও এস-অ্যালিল সিস্টেইনের মতো যৌগও রসুনের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণে ভূমিকা রাখতে পারে।

রসুনে ক্যালোরির পরিমাণ কম। একটি মাঝারি আকারের কোয়ায় (প্রায় ৩ গ্রাম) থাকে আনুমানিক ৪ থেকে ৫ ক্যালোরি, ০.২ গ্রাম প্রোটিন ও প্রায় ১ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট। এতে ম্যাঙ্গানিজ, ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি ও সেলেনিয়ামের মতো পুষ্টি উপাদানও অল্প পরিমাণে রয়েছে।
তবে সাধারণত রসুন রান্নায় অল্প পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। তাই একে এসব পুষ্টি উপাদানের প্রধান উৎস না ভেবে সুষম খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।
রসুনের কিছু যৌগ রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ২০১৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, তিন মাস ধরে এজড গার্লিক এক্সট্র্যাক্ট (AGE) গ্রহণকারীদের মধ্যে সর্দি-ফ্লুর মৌসুমে উপসর্গের তীব্রতা ও অসুস্থতার কারণে স্কুল বা কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতির দিন কম ছিল।
এ ছাড়া পরীক্ষাগারভিত্তিক কিছু গবেষণায় রসুনের যৌগের সম্ভাব্য অ্যান্টিভাইরাল বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এসব ফলাফল থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না যে রসুন খেলে সর্দি-ফ্লু প্রতিরোধ করা যাবে বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা হবে। এ বিষয়ে আরও শক্তিশালী মানবভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন।
উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে রসুনের নির্যাস বা সাপ্লিমেন্ট রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
২০১৯ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় রসুনের অ্যালিসিনের সম্ভাব্য কার্যপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই যৌগ অ্যাঞ্জিওটেনসিন-২-এর কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে এবং রক্তনালি শিথিল হওয়ার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২০ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনাতেও রসুনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের সঙ্গে রক্তচাপ হ্রাসের সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে গবেষণার ফলাফল ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। রসুনের সাপ্লিমেন্টকে চিকিৎসকের দেওয়া রক্তচাপের ওষুধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
রক্তে মোট কোলেস্টেরল ও এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ২০১৮ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, রসুনের কিছু প্রস্তুতি মোট কোলেস্টেরল ও এলডিএলের মাত্রা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
২০১৬ সালের আরেকটি পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, দুই মাসের বেশি সময় রসুনের সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে কিছু মানুষের এলডিএল কোলেস্টেরল প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে এই প্রভাব সবার ক্ষেত্রে সমান নয় এবং গবেষণার ফলাফলও পুরোপুরি একরকম নয়।
অন্যদিকে, ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমানো কিংবা এইচডিএল বা ‘ভালো’ কোলেস্টেরল বাড়ানোর ক্ষেত্রে রসুনের প্রভাবের যথেষ্ট ধারাবাহিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ।
রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে রসুন ব্যবহার সাধারণত নিরাপদ। তবে বেশি পরিমাণে কাঁচা রসুন খেলে কারও কারও বুকজ্বালা, পেটের অস্বস্তি বা মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে। রসুনের সাপ্লিমেন্ট রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং কিছু ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে।
বিশেষ করে রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তি, অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন কেউ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের রসুনের সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে, রসুন সুষম খাদ্যাভ্যাসের একটি উপকারী উপাদান হতে পারে। তবে এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণকে অতিরঞ্জিত না করে মনে রাখা প্রয়োজন—রসুন কোনো রোগের নিশ্চিত প্রতিষেধক নয় এবং উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসার বিকল্পও নয়।


