
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেও বিশ্ববাজারে আবারও কমেছে অপরিশোধিত তেলের দাম। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের তেলের মজুত বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৪৯ ডলারে নেমেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ৪৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

তেলের দাম কমার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতিকে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ইরান ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল সরবরাহ যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার প্রায় ৮১ শতাংশে ফিরে এসেছে। এ ক্ষেত্রে সৌদি আরবের উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির বড় ভূমিকা রয়েছে।
রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকের সরবরাহ বাড়ায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।
জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত
বিশ্ববাজারে তেলের দামে চাপ তৈরির আরেকটি কারণ বড় অর্থনীতিগুলোর সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ। জি৭ দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে হঠাৎ করে বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কমেছে। একই সঙ্গে বাজারে বাড়তি সরবরাহের সম্ভাবনা তেলের দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি করছে।
চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা
তেলের দাম শুধু সরবরাহের ওপর নির্ভর করে না; বৈশ্বিক চাহিদাও এতে বড় ভূমিকা রাখে। বিশ্ব অর্থনীতির গতি কমে গেলে শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার কমতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে তেলের চাহিদা কমার আশঙ্কা তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা আগেভাগেই বিক্রির দিকে ঝুঁকতে পারেন। এতে বাজারে দাম কমার প্রবণতা আরও জোরালো হয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) চলতি বছরের তেলবাজার নিয়ে চাহিদা ও সরবরাহের পূর্বাভাসেও পরিবর্তন এনেছে। সংস্থাটির মাসিক তেলবাজার প্রতিবেদনে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক উৎপাদন, ব্যবহার ও তেলের মজুতে সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) বলছে, বিশ্ববাজারে তেলের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় বেশি হলে মজুত বাড়তে থাকে। আর মজুত বাড়ার সঙ্গে সাধারণত অপরিশোধিত তেলের দামে নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়।
ইআইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের পর তেলের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে বৈশ্বিক মজুতও আবার বাড়তে পারে। এর ফলে আগামী বছর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। সংস্থাটি ২০২৭ সালে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৪ ডলার** হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ পুনরুদ্ধার, বড় অর্থনীতিগুলোর জরুরি মজুত থেকে তেল ছাড়ার উদ্যোগ এবং বৈশ্বিক চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা—এই তিনটি বিষয়ই বর্তমানে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে দাম কমার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে।


