
চার আরএনবি সদস্য বরখাস্ত, তদন্তে কমিটি
ধূমকেতুর যাত্রা বাতিল, আটকে পড়ে ট্রেন
ভাঙচুরে আতঙ্কে যাত্রী-কর্মচারীরা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এক শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাতভর উত্তপ্ত ছিল রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের রেললাইন অবরোধ, অগ্নিসংযোগ ও স্টেশনে ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনায় স্থবির হয়ে পড়ে রেল যোগাযোগ। ভাঙচুর করা হয় স্টেশনের বিভিন্ন কার্যালয়, কাচের জানালা, সিসিটিভি ক্যামেরা, সাইনবোর্ড, ডাস্টবিন ও অন্যান্য স্থাপনা। আতঙ্কে স্টেশন ছেড়ে চলে যান অনেক যাত্রী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী।
ঘটনার জেরে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চার সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে সোমবার সকালে ঘটনার তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঘটনার সূত্রপাত। রাবির ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আইয়ুব আলী তাঁর চাচাকে নিতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে যান। এ সময় স্টেশনে ইংরেজি বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তাকর্মীদের কথা-কাটাকাটি চলছিল। একপর্যায়ে পরিস্থিতি থামাতে এগিয়ে গেলে আইয়ুবকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
আইয়ুবের সহপাঠী নাইমুল ইসলাম অভ্রের ভাষ্য, পরিস্থিতি শান্ত করতেই সেখানে গিয়েছিলেন আইয়ুব। পরে তাঁকে একা পেয়ে মারধর করা হয়। এতে তিনি মাটিতে পড়ে যান। তাঁর নাক দিয়ে রক্তপাত ও কয়েকবার বমি হয়। পরে তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনার পর তাঁর চিকিৎসাধীন থাকার বিষয়টিও একাধিক প্রতিবেদনে এসেছে।
ঘটনার একটি ২৬ সেকেন্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাবির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজারসংলগ্ন রেললাইনে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। একপর্যায়ে তাঁরা ‘মার্চ টু রাজশাহী রেলস্টেশন’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার।
তিনি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তিনি হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এবং ব্যবস্থা না হলে ট্রেন থামিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের আটকের হুঁশিয়ারি দেন। পরে রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রেললাইন ধরে স্টেশনের দিকে অগ্রসর হয়।
স্টেশনে ঢুকে ভাঙচুর
স্টেশনে প্রবেশের পর একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাছের ডাল, বাঁশ, লাঠি ও ইটপাটকেল ব্যবহার করে স্টেশনের কাচের জানালা, ডাস্টবিন, দোকানপাট, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কক্ষ, বিভিন্ন কার্যালয়, সাইনবোর্ড ও সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও স্টেশনের কক্ষ, দরজা-জানালা ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা এসেছে।
এ সময় স্টেশনে থাকা যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তার কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও স্টেশনের ভেতর থেকে বের হয়ে বাইরে অবস্থান করতে বলা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্টেশনে তালা দিয়ে নিরাপদ স্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে জানান স্টেশনমাস্টার।
ভাঙচুর ও রেললাইন অবরোধের কারণে রোববার রাত ১১টা ২০ মিনিটের ঢাকাগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেসের যাত্রা বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে কয়েকটি ট্রেন বিভিন্ন স্থানে আটকা পড়ে।
দুই ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীদের সরানো হয়
রাত ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে যান রাবির প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান। তিনি শিক্ষার্থীদের শান্ত হয়ে স্টেশন ত্যাগ করার অনুরোধ করেন। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান ঘটনাস্থলে গেলে শিক্ষার্থীরা তাঁদের উদ্দেশে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন।
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে স্টেশন ঘেরাও ও ভাঙচুরের পর উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপস্থিতিতে রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে শিক্ষার্থীদের স্টেশন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ক্ষমা না চাওয়ার কথা জানান। তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিচার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা বিষয়টি থেকে সরে যাবেন না।
বরখাস্ত ৪ আরএনবি সদস্য
ঘটনার মধ্যেই রোববার রাতে চার আরএনবি সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ রেলওয়ে (পশ্চিম)-এর চিফ কমান্ড্যান্ট মোহা. আশাবুল ইসলাম স্বাক্ষরিত দপ্তরাদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
বরখাস্ত হওয়া সদস্যরা হলেন—মো. আরিফ হোসেন, মো. রোকন উদ্দীন, মো. শফিকুল ইসলাম ও মো. শাহাদত হোসেন। রেলওয়ের দপ্তরাদেশ অনুযায়ী, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তদন্তে চার সদস্যের কমিটি
এরপর সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে ঘটনার তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে রয়েছেন পাকশী বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা, পাকশী বিভাগীয় চিকিৎসক কর্মকর্তা, পাকশী বিভাগীয় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী এবং পাকশী কমান্ড্যান্ট, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী।
অর্থাৎ, শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ থেকে শুরু হয়ে স্টেশন ভাঙচুর পর্যন্ত পুরো ঘটনাই এখন তদন্তের আওতায় এসেছে।
দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসে পরিস্থিতি শান্ত
রাবির প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি শান্ত করা সম্ভব হয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে ক্যাম্পাসে ফিরে গেছেন। আশা করি, সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করবেন এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।
আহত শিক্ষার্থীকে দেখতে গিয়ে রাবির উপাচার্য ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। রেলের কর্মচারীরা তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে মারধর করেছেন। আমি নিউরোসার্জনের সঙ্গে কথা বলেছি। তাকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। আমরা বিষয়টি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছি।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীর চিকিৎসাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রেলের নিরাপত্তারক্ষী, টিটি ও গার্ডসহ সংশ্লিষ্টদের আচরণের প্রতিবাদ জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও পুলিশকে অনুরোধ করা হয়েছে।
সাড়ে চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ রেললাইন
শিক্ষার্থীরা স্টেশন ছেড়ে গেলেও রেললাইন তখনও অবরুদ্ধ ছিল। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, রাত সাড়ে চারটা পর্যন্ত রেললাইন অবরুদ্ধ ছিল। এরপর রেল চলাচল শুরু হয়।
তিনি জানান, রাতে দুটি ট্রেন আটকে ছিল। এর একটি সারদা রোড এলাকায় এবং অন্যটি মধুমতি এক্সপ্রেস হরিয়ানে অবস্থান করছিল। পরে ভোরে ট্রেনগুলো স্টেশনে আসতে শুরু করে। সকালে কয়েকটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যায়। তবে মধুমতি এক্সপ্রেস দেরিতে আসায় বনলতা এক্সপ্রেস প্রায় ৪০ মিনিট দেরিতে ছাড়ে। সিল্ক সিটি ও মহানন্দা এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়েই ছেড়ে যায়।
সোমবার সকাল থেকে রাজশাহী-ঢাকা, রাজশাহী-খুলনা, রাজশাহী-চিলাহাটি ও রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
রাতের ঘটনায় এখন সামনে এসেছে দুটি প্রশ্ন—শিক্ষার্থী আইয়ুব আলীকে মারধরের অভিযোগের প্রকৃত সত্য কী এবং সেই ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে রেলওয়ের সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর ও রেল যোগাযোগ বন্ধের দায় কার। রেলওয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপরই এখন নির্ভর করছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র ও পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা।



