
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিদ্যালয়ের পাঠদানের চিরায়ত গাম্ভীর্য পুনরুদ্ধার এবং শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলা রক্ষায় নজিরবিহীন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ভারতের বিহার রাজ্য সরকার। শিক্ষাঙ্গনের ভেতর উচ্চশব্দে ডিজে গান বাজানো, ডিস্কো নাচ এবং যে কোনো ধরনের চটুল বিনোদনমূলক আয়োজন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যের সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জিন্স, টি-শার্টের মতো অনানুষ্ঠানিক পোশাক পরিহার করে মার্জিত ‘ফরমাল’ বা আনুষ্ঠানিক পোশাক পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন এই নির্দেশনার ফলে পাঠদানের কর্মঘণ্টায় শিক্ষকদের পেশাগত ভাবমূর্তি বজায় রাখা এবং ক্যাম্পাসের ভেতরে সুস্থ অ্যাকাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যের শিক্ষা দফতর থেকে জারি করা এই প্রজ্ঞাপন প্রকাশ্যে আসার পরই পুরো রাজ্যজুড়ে মিশ্র ও ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। নির্দেশনায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, শিক্ষা প্রাঙ্গণ কোনো বিনোদনকেন্দ্র বা সাধারণ প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি জ্ঞানচর্চা ও মূল্যবোধ গঠনের স্থান। তাই শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের চেয়ে শিক্ষাঙ্গনের সামগ্রিক মর্যাদা ও শৃঙ্খলাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কঠোর নির্দেশনায় শিক্ষা দফতর
বিহারের শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারি এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, রাজ্যজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুকূল ও শ্রদ্ধাশীল পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই নীতিগত সংস্কার আনা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, নির্দেশিকাটি যাতে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিটি বিদ্যালয়ে শতভাগ কার্যকর হয়, সে বিষয়ে শিক্ষা বিভাগ থেকে সুস্পষ্ট রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিক্ষা দফতরের প্রশাসন পরিচালক বিজয় কুমার পান্ডের স্বাক্ষরিত এই সরকারি আদেশটি গত ৩০ অক্টোবর জারি করা হয়। আদেশে রাজ্যের সকল জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে নিজ নিজ অধিক্ষেত্রে অবস্থিত স্কুল ও প্রশাসনিক দফতরগুলোতে তদারকি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্মকালীন সময়ে কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী যাতে এই নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটাতে না পারেন, তা নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে প্রশাসনকে নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে আদেশে।
ক্যাম্পাসে অনুচিত বিনোদনে লাগাম
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আয়োজিত নানা উৎসবে বা অনুষ্ঠানে শিক্ষাঙ্গনের সংস্কৃতির পরিপন্থী পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছিল। বহু স্কুলে শিক্ষার্থীদের বিদায় অনুষ্ঠান, বর্ষবরণ কিংবা বিভিন্ন দিবস উদযাপনের নামে বহিরাগত সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া করে এনে চটুল হিন্দি ও স্থানীয় ভাষার গানে ডিজে পার্টি এবং ডিস্কো নাচের আয়োজন করা হচ্ছিল। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে অভিভাবক মহল এবং সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
শিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে ক্যাম্পাসে ডিজে সেট বসিয়ে উচ্চৈঃস্বরে গান বাজানো এবং অনিয়ন্ত্রিত নাচের মতো অনুচিত বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দফতর থেকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, স্কুল চত্বরে শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিক বিকাশের অন্তরায় এমন কোনো কার্যক্রম বরদাশত করা হবে না। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে কোনোভাবেই বাণিজ্যিক বিনোদন বা অনিয়ন্ত্রিত উৎসবের চত্বরে পরিণত করার সুযোগ নেই।
কেবল মার্জিত সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ
বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও শিক্ষার্থীদের সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশকে রুদ্ধ করা সরকারের উদ্দেশ্য নয় বলে আদেশে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, শিক্ষাঙ্গন থেকে সংস্কৃতিচর্চাকে নির্বাসিত করা হচ্ছে না, বরং সংস্কৃতির নামে চলা বিকৃতিকে রোধ করা হচ্ছে।
শিক্ষা দফতর নির্দেশ দিয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত দিবসগুলোতে নিয়ম মেনে এবং সর্বোচ্চ শালীনতা বজায় রেখে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা যাবে। তবে সে ক্ষেত্রেও গান ও নাচের নির্বাচন হতে হবে মার্জিত, শিক্ষণীয় ও ঐতিহ্যানুগ। কোনো অবস্থাতেই বিকৃত সুর, অঙ্গভঙ্গি কিংবা উচ্চশব্দের ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। কেবল ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, শাস্ত্রীয় বা দেশের গান এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ রুচিশীল পরিবেশনাই স্কুল চত্বরে গ্রহণযোগ্য হবে।
ক্যাজুয়াল পোশাক বর্জন ও আগের নির্দেশ অমান্য
শিক্ষকদের পোশাকের বিষয়ে শিক্ষা দফতর জানিয়েছে, এর আগেও শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীদের জন্য পরিচ্ছন্ন ও শোভন পোশাক পরিধানের জন্য মৌখিক ও লিখিত পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষক ও কর্মী সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিয়মিত জিন্স, ফিটেড টি-শার্ট কিংবা ক্যাজুয়াল পোশাক পরে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান অব্যাহত রেখেছেন।
সরকারি আদেশে অসন্তোষ প্রকাশ করে উল্লেখ করা হয়, শিক্ষক হলেন শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ বা রোল মডেল। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব ও বেশভূষা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলে। শিক্ষকরা যদি চটুল বা অনানুষ্ঠানিক পোশাকে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হন, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের গাম্ভীর্যকে দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করে। শিক্ষা বিভাগের মতে, এ ধরনের উদাসীন চর্চা শিক্ষার সামগ্রিক পরিমণ্ডলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে এবং একটি আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থায় এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ফলে এখন থেকে পুরুষ ও নারী উভয় কর্মীদের ক্ষেত্রেই মার্জিত ও আনুষ্ঠানিক পোশাকের বিধান কঠোরভাবে মানতে হবে।
তদারকি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
শিক্ষা দফতরের এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন ও পরিদর্শকদের বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি জেলার শিক্ষা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে আকস্মিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে। কোনো প্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত নিয়মের বাইরে অননুমোদিত বিনোদনমূলক আয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ওপর সরাসরি দায় বর্তাবে। একইভাবে কোনো শিক্ষক নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক পোশাকবিধি লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে সার্ভিস রুল অনুযায়ী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শ্রেণিকক্ষকে আধুনিক যুগোপযোগী করার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনাই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। বিহার সরকারের এই সময়োপযোগী ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও নতুন গতিশীলতা আনবে বলে প্রত্যাশা করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


