
ভাঙনে ঘরবাড়ি-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীতে, পানিবন্দি ৫০ হাজার; সাপের আতঙ্ক
পদ্মার পানি নামতে শুরু করেছে। কোথাও সামান্য কমেছে, কোথাও আবার এখনো বিপৎসীমার কাছাকাছি। কিন্তু পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তি ফেরেনি রাজশাহীর চরাঞ্চলের মানুষের জীবনে। বরং বন্যা ও নদীভাঙনের ক্ষত আরও গভীর হচ্ছে। কোথাও ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে; কোথাও পানিবন্দি মানুষ খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদিপশুর খাদ্যের সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যেই নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে সাপের উপদ্রব।

নদীর পানি বাড়ার সময় নিচু এলাকা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সাপ উঠে আসছে উঁচু জায়গা ও লোকালয়ের দিকে—এমন দাবি চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের। রাজশাহী নগরীর সীমান্তবর্তী অবকাশ এলাকাতেও কয়েক দিনে একাধিক সাপ দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ফলে বন্যার পানির সঙ্গে এখন বিষধর সাপের ভয়ও তাড়া করছে দুর্গত মানুষকে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় নগরের বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২৮ মিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার মাত্র ৭৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নদীর পানি। আগের দিন রোববার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ৩০ মিটার। এর আগে শনিবারও ছিল একই উচ্চতায়। শুক্রবার সকাল ৯টায় ছিল ১৭ দশমিক ২০, বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ১৭ দশমিক ১২ এবং বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় ১৬ দশমিক ৯৫ মিটার।
অর্থাৎ রোববার থেকে সোমবার সামান্য পানি কমলেও গত বুধবারের তুলনায় এখনো প্রায় ৩৩ সেন্টিমিটার বেশি উচ্চতায় রয়েছে পদ্মার পানি। ফলে পানি কমার আভাস মিললেও নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলের দুর্ভোগ এখনই কাটছে না।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীর পবা উপজেলার চর খিদিরপুর, খানপুর, মাঝারদিয়াড়, ১০ নম্বর চর, চর আষাড়িয়াদহসহ নদীর ওপারের বিভিন্ন চরাঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। অনেকের ঘর ও উঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে স্বাভাবিক চলাচল। কোথাও রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও দেখা দিয়েছে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদিপশুর খাদ্যের সংকট।
পানির সঙ্গে নতুন আতঙ্ক সাপ
বন্যার পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চরাঞ্চলে বাড়ছে সাপের আতঙ্ক। স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীর পানি বাড়ার কারণে নিচু জায়গা থেকে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ উঁচু ও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে উঠে আসছে। পরে সেগুলো লোকালয়, ঘরবাড়ি ও মানুষের চলাচলের জায়গায় চলে আসায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজশাহী নগরীর সীমান্তবর্তী পদ্মাপাড়ের অবকাশ এলাকাতেও গত কয়েক দিনে একাধিক সাপ দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাদের দাবি, এর মধ্যে বিষধর রাসেল ভাইপারও রয়েছে।
স্থানীয় কিশোর ইকবাল হোসেন বলেন, পানির মধ্য থেকে বড় একটি সাপ উঠে আসতে দেখেছে সে। পরে ঘাটের কাছে সাপটিকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়রা সেটি মেরে ফেলেন।
সাগোরা বেগম নামে এক নারী বলেন, তিনিও একটি বড় সাপ দেখেছেন। সেটিকে মারার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি চলে যায়।
নান্নু নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, পানি বাড়লে নিচু জায়গা থেকে সাপ উঁচু জায়গায় উঠে আসে। এখন সাপগুলো লোকালয়ের দিকেও চলে আসছে। এ কারণে মানুষ আতঙ্কে আছে।
বন্যাকবলিত এলাকায় সাপের আতঙ্কের মধ্যে চিকিৎসা প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাপে কাটার রোগীদের চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে। সাপে কাটার রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং অ্যান্টিভেনম বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।
ভাঙনে শেষ আশ্রয়টুকুও অনিশ্চিত
বন্যার পানির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছে নদীভাঙনে। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নে কয়েক দিনের ব্যবধানে পদ্মার ভাঙনে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদান। স্থানীয়দের দাবি, এরই মধ্যে শতাধিক বসতবাড়ি ও কয়েকটি মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
চরাঞ্চলের মানুষের কাছে তাই পানি কমা মানেই স্বস্তি নয়। একদিকে পানির নিচে ঘরবাড়ি, অন্যদিকে ভাঙনের মুখে শেষ সম্বলটুকুও। অনেকে গরু-ছাগল, ধান, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় মালামাল নৌকায় তুলে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন।
একাধিক চরবাসী জানান, নদীর পানি কমতে শুরু করলেও অনেক জায়গায় নতুন করে ভাঙন দেখা দিচ্ছে। ফলে কোথায় রাত কাটাবেন, আর কোথায় ঘর তুলে বসবাস করবেন—এ নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানি কমলেও দুর্ভোগ বহাল
চাঁপাইনবাবগঞ্জে নদ-নদীর পানি পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তির আভাস মিলেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯ টায় পদ্মা নদীর পাংখা গেজ স্টেশনে পানির সমতল ছিলো ২১ দশমিক ৬৮, মহানন্দা নদী খালঘাট গেজ স্টেশনে ১৯ দশমিক ৪৭ ও পূনর্ভবা নদী রহনপুর গেজ স্টেশন ১৯ দশমিক ৫৬ মিটার। গত
রোববার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি ৬ সেন্টিমিটার, মহানন্দার ৩ সেন্টিমিটার এবং পুনর্ভবার পানি ৪ সেন্টিমিটার কমেছে। পদ্মার পানি এখন বিপৎসীমার ৩২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তবে পানি কমলেও জেলার সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের প্রায় ৪ হাজার পরিবার এখনো পানিবন্দি। এর মধ্যে সদর উপজেলার নারায়ণপুরে ১ হাজার ৩০০, আলাতুলিতে ৫০০ এবং শিবগঞ্জের পাকা ইউনিয়নে ১ হাজার ৭০০, উজিরপুরে ২৫০ ও দুর্লভপুরে ২৫০ পরিবার রয়েছে।
বন্যার পানিতে জেলার পাঁচ উপজেলায় ৫৬ দশমিক ৫ হেক্টর ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ২ দশমিক ৯, আমন ৪, মাসকলাই ৩১ দশমিক ৫, শাকসবজি ১৪ দশমিক ২, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা ৩ দশমিক ৪ ও হলুদ শূন্য দশমিক ৫ হেক্টর।
শিবগঞ্জে বন্যার কারণে ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। দুর্গতদের সহায়তায় ১১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম। সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়নেও ১ হাজার ৮২৮ পরিবার পানিবন্দি রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে নদ-নদীতে পানি বেড়েছিল। তবে পানি কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
টি-বাঁধে জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ
পদ্মার পানি এখনো বিপৎসীমার কাছাকাছি থাকায় রাজশাহী নগরীর টি-বাঁধ এলাকায় সতর্কতা বহাল রয়েছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সেখানে জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। যে টি-বাঁধে বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় মানুষের ভিড় জমত, সেখানে এখন অনেকটাই নীরবতা।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে জরুরি সতর্কতা হিসেবে টি-বাঁধ এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে সেখানে প্রবেশ বা জড়ো না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি নগর রক্ষা বাঁধ ও নদীতীরবর্তী অবকাঠামোর পরিস্থিতিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক কাজী শাহিদুল ইসলাম বলেন, পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঠেকাতে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করা হচ্ছে। আকস্মিক বন্যার ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত ২০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিতরণও শুরু হয়েছে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের শহর রক্ষা শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী আবু হুরাইরা বলেন, পদ্মার পানি ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। পানি নিয়মিত পরিমাপ করা হচ্ছে। এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকায় বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি কম। তবে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।
পদ্মার পানি কমার আভাস মিলেছে—কিন্তু চরবাসীর কাছে দুর্ভোগের গল্প এখনো শেষ হয়নি। পানির সঙ্গে লড়াই করতে করতে যাদের ঘর গেছে, জমি গেছে, স্কুল-মসজিদ গেছে, তাদের সামনে এখন নতুন প্রশ্ন—পানি নামলে ফিরবেন কোথায়? আর রাতের অন্ধকারে ঘরে ঢুকে পড়া সাপের ভয় থেকে কীভাবে বাঁচবেন?


