
আকর্ষণীয় মোড়কে মানহীন পণ্যে বাজার সয়লাব, নজরদারির অভাব
আব্দুল্লাহ আল শামস, দুর্গাপুর (রাজশাহী) প্রতিনিধিঃ বাহারি রঙের মোড়ক আর খেলনার প্রলোভনে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার হাটবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন অনুমোদনহীন, মানহীন ও অস্বাস্থ্যকর শিশু খাদ্য। গ্রামের পাড়া-মহল্লার মুদি দোকান থেকে শুরু করে বাজারের বড় কনফেকশনারি—সবখানেই সয়লাব এসব খাদ্যপণ্য। মান নিয়ন্ত্রণকারী কোনো সংস্থার ছাড়পত্র ছাড়াই প্রকাশ্যে এসব পণ্য বিক্রি হওয়ায় কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কার্যকর প্রশাসনিক নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান না থাকায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহল।

স্কুল গেটেই রঙিন খাবারের ফাঁদ
সরেজমিনে দুর্গাপুরের বিভিন্ন হাটবাজার, প্রধান সড়কের মোড় এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা গেছে বিপজ্জনক চিত্র। স্কুলের মূল ফটক ঘেঁষে গড়ে ওঠা দোকানগুলোতে ঝুলছে রঙিন কৃত্রিম জুস, রঙিন পানীয়, ললিপপ, বোতলজাত নিম্নমানের লাচ্ছি, চিপস, চকলেট, ক্যান্ডি, চাটনি, চুইংগাম ও নিম্নমানের আইসক্রিম। শিশুদের নজর কাড়তে প্যাকেটের গায়ে জুড়ে দেওয়া হয়েছে কার্টুন ও বাহারি ছবি। অনেক পণ্যের প্যাকেটের ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে সস্তা প্লাস্টিকের খেলনা। খেলনার লোভে শিশুরা টিফিনের টাকা দিয়ে মানহীন এসব খাবার কিনে খাচ্ছে।
নেই বিএসটিআই সনদ, নকল সিলের কারসাজি
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া এসব পণ্যের সিংহভাগের গায়েই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঠিক নাম-ঠিকানা, উৎপাদনের উপাদান, উৎপাদনের তারিখ কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ নেই। কোনো কোনো পণ্যের মোড়কে বিএসটিআইয়ের সিলের মতো ভুয়া ও অস্পষ্ট প্রতীক ছাপিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা করা হচ্ছে। খালি চোখে দেখে বোঝার উপায় নেই পণ্যগুলোর গুণগত মান ও রাসায়নিক উপাদান কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই অজ্ঞাত উৎস থেকে আসা এসব খাদ্যপণ্য প্রতিদিন পৌঁছাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের দোকানে।
পেটের পীড়া থেকে দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অননুমোদিত খাবারে ব্যবহৃত হচ্ছে নিষিদ্ধ কৃত্রিম রং, মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর চিনি ও নিম্নমানের রাসায়নিক। ফলে এগুলো গ্রহণের পর শিশুরা ঘন ঘন ডায়রিয়া, বমি, পেটব্যথা ও আমাশয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের ফলে শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া ছাড়াও লিভার ও কিডনিতে জটিলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতা তৈরি হতে পারে।
তদারকি জোরদার ও মূল উৎস বন্ধের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে দুর্গাপুরে এসব ক্ষতিকর খাদ্যের বেচাকেনা চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে প্রকাশ্যে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য বিক্রি হলেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান কিংবা খাদ্যমান পরীক্ষার উদ্যোগ দেখা যায় না। ফলে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র মুনাফা লুটলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
সচেতন মহলের দাবি, কেবল খুচরা বিক্রেতাদের জরিমানা করলেই এই সংকট কাটবে না; উপজেলা প্রশাসন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে এসব অবৈধ কারখানা ও পাইকারি সরবরাহকারী চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে শিশুদের সুরক্ষায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে মানহীন খাবারের বিক্রি নিষিদ্ধ করে নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


