
অভাব জয় করে সাফল্য, উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরিবার
মৌসুমী দাস, চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধিঃ একই দিনে জন্ম, একই সাথে বেড়ে ওঠা, এমনকি আর্থিক টানাপোড়েনে একটি পাঠ্যবই ভাগাভাগি করেই পড়াশোনা। তীব্র দারিদ্র্য আর সীমাবদ্ধতাকে জয় করে অদম্য ইচ্ছাশক্তির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার যমজ দুই বোন আয়েশা আক্তার তোয়া ও খাদিজা আক্তার তানহা। এসএসসির ধারাবাহিকতায় এবার এইচএসসি পরীক্ষাতেও মানবিক বিভাগ থেকে দুজনই অর্জন করেছে জিপিএ-৫। তবে সাফল্যের এই বাঁধভাঙা আনন্দের মাঝেও দরিদ্র পরিবারটিতে ভর করেছে এক গভীর উদ্বেগ—অভাবের সংসারে দুই বোনের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ হবে তো?

তোয়া ও তানহা উপজেলার আস্করপুর গ্রামের রডমিস্ত্রি তুফান আলী ও গৃহিণী সালমা বেগম দম্পতির সন্তান। সরদহ সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অভাবনীয় এ সাফল্য দেখায় তারা। বসতভিটা ছাড়া কোনো জমিজমা নেই দিনমজুর বাবার; তাঁর একার আয়েই চলে তিন মেয়েসহ পাঁচ সদস্যের সংসার। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে দুই মেয়ের এমন ধারাবাহিক অর্জন পুরো এলাকার মানুষকেও অনুপ্রাণিত করেছে।
একটি বইয়েই মেধার লড়াই
রোববার আস্করপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, জীর্ণ মাটির ঘরে দুই বোনের আকাশছোঁয়া স্বপ্নের প্রস্তুতি। একই ক্লাসে পড়ায় আর্থিক অনটনের কারণে আলাদা বই কেনা সম্ভব হয়নি; বছরের পর বছর একটি বই ভাগাভাগি করেই টেবিল ভাগ করেছে দুজন। তোয়া জানায়, “আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না হলেও শিক্ষক ও বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণায় আমরা এগিয়েছি। এখন লক্ষ্য দেশের শীর্ষ কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়াশোনা করা।”
ভবিষ্যৎ লক্ষ্যের কথা জানিয়ে তানহা বলে, “আমরা দুই বোনই উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিসিএস দিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিতে চাই। সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
ফলাফল বিপর্যয়ের মাঝেও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত
এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে মানবিক বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন ছিল অত্যন্ত কঠিন। ক্যাডেট কলেজ বাদে পুরো চারঘাট উপজেলায় এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ১৩ জন শিক্ষার্থী; যার মধ্যে এই দুই অদম্য বোন তাদের নাম লিখিয়েছে।
উচ্চশিক্ষা নিয়ে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তা
মেয়েদের অভাবনীয় অর্জনে খুশি হলেও ভবিষ্যৎ খরচের কথা ভেবে চোখে জল মা সালমা বেগমের। তিনি বলেন, “দৈনিক যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে দুবেলা ভাত জোটে। কোচিং বা রাজশাহীর বাইরে পাঠিয়ে ভর্তি প্রস্তুতির সামর্থ্য আমাদের নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্য নিয়ে নিজেরাই ঘরে বসে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আগামী দিনগুলোতে তাদের পড়ার খরচ কীভাবে চালাব, ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না।” কাজের প্রয়োজনে বাইরে থাকা বাবা তুফান আলী মুঠোফোনে জানান, তাঁর তিন মেয়েই তাঁর কাছে রাজকন্যা; হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়েও তিনি মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে চান।
সরদহ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সামসুল হক বলেন, তোয়া ও তানহা অত্যন্ত বিনয়ী, অধ্যবসায়ী ও মেধাবী শিক্ষার্থী। দারিদ্র্য যে প্রতিভার পথে স্থায়ী দেয়াল হতে পারে না, তারা তা প্রমাণ করেছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের পাশে থাকবে, তবে তাদের স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে হৃদয়বান ব্যক্তি ও সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।


