
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দিয়ে পরিচিতি পাওয়া এই তরুণদের আন্দোলন এখন বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থা ও ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে রাজপথে সরব। প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দল কংগ্রেসের পাশাপাশি নতুন এই আন্দোলনও মোদি সরকারের রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে পৌঁছানোর পর আটক হন। নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ ঠেকাতে রাজধানীতে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়

৩১ বছর বয়সী দীপকের উত্থানের শুরু চলতি বছরের মে মাসে। বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে দেওয়া এক মন্তব্যের জবাবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘সব তেলাপোকা একসঙ্গে হলে কী হবে?’
ছোট্ট এই ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। এর সূত্র ধরে গড়ে ওঠে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, যা শুরুতে অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হলেও পরে তরুণদের প্রতিবাদী আন্দোলনে রূপ নেয়।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে আন্দোলনটির নেতাদের পাশাপাশি বিরোধী রাজনীতিক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মীদেরও আটক করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশি তৎপরতা জোরদার করা হয়।
ককরোচ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে। প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে আন্দোলনকারীরা বিষয়টি সামনে এনে প্রতিবাদ শুরু করেন। পরে আন্দোলনের চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়।
গত ২৫ জুলাই পদত্যাগ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা জনচাপের মধ্যে তার পদত্যাগ মোদির মন্ত্রিসভার জন্য বিরল ঘটনা ছিল। এরপর থেকে দীপকে ও তার সমর্থকেরা সরকারি স্কুলের অবকাঠামো, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রচার চালিয়ে আসছেন।
এবার আন্দোলনের কেন্দ্রে ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন। বিরোধীদের অভিযোগ, তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। খসড়া তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক সংগঠন।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের জেরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, সংশোধনপ্রক্রিয়ায় চিহ্নিত বিভিন্ন এন্ট্রির কারণে নাম বাদ পড়ার সংখ্যা বেড়েছে এবং ভুলভাবে বাদ পড়া যোগ্য ভোটাররা পুনরায় নিবন্ধন করতে পারবেন।
দীপকে ও তার সমর্থকেরা নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকার এই পরিবর্তন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনী সুবিধা বাড়াতে পারে। তবে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে মোদি সরকারের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে পরিচিত কংগ্রেস। তবে ককরোচ আন্দোলনের উত্থান দেখাচ্ছে, তরুণদের ক্ষোভ এখন শুধু প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর একটি আন্দোলনও শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও নির্বাচনপ্রক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনমত সংগঠিত করতে পারে।
দীপকে নিজেও তার সংগঠনকে প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়, বরং সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার একটি চাপ সৃষ্টিকারী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য, আন্দোলনকারীরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবেন না; গণতন্ত্র রক্ষায় তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা ও গণআটকের ঘটনা আন্দোলনটিকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেও বিষয়টি ভারতের গণতান্ত্রিক পরিসর, বিরোধী মতের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।


