
মোহনপুর (রাজশাহী) প্রতিনিধি: রাকিবুল ইসলামঃ রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে মোহনপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার মান ও ফলাফলে সুনাম অর্জন করলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও কর্মচারীর অভাবে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় ৪০০ ছাত্রীর বিপরীতে বিদ্যালয়টিতে সরকারি শিক্ষক রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। দীর্ঘ প্রায় ৩৮ বছরেও বাড়েনি শিক্ষক পদ। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষক, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসহ প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় বাড়তি চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মরত শিক্ষকরা।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮১ সালে মোহনপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয়করণের সময় বিদ্যালয়ে পাঁচটি সহকারী শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তখন ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান কার্যক্রম চালু ছিল। পরে শিক্ষার্থীদের চাহিদা বিবেচনায় নবম ও দশম শ্রেণিতে পাঠদান শুরু হলেও বাড়েনি শিক্ষক পদ। ফলে সীমিত জনবল দিয়েই চলছে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ৪০০ ছাত্রী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষক সংকটের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার ফলাফলে সাফল্য ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয় থেকে ৭৭ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ১৯ জন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় ১০ শিক্ষার্থী সরকারি বৃত্তি পেয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজন ট্যালেন্টপুলে এবং পাঁচজন সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি অর্জন করে।
তবে এ সাফল্যের আড়ালে রয়েছে শিক্ষক সংকটের বাস্তবতা। বিদ্যালয়ে ইংরেজি, গণিত, জীববিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা, ভূগোল, চারুকলা, শারীরিক শিক্ষা ও আইসিটি বিষয়ে শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। ফলে নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক পাঠদান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বাংলা বিষয়ে পাঠদান করছেন। সিনিয়র শিক্ষক আব্দুল লতিফ কৃষিশিক্ষা, মামুন অর রশিদ সামাজিক বিজ্ঞান, রুবেল আহমেদ ভৌতবিজ্ঞান এবং রাশেদ বিন আবেদ ধর্মীয় বিষয়ে পাঠদান করছেন। মাত্র পাঁচজন শিক্ষককে বিভিন্ন শ্রেণিতে পাঠদানের পাশাপাশি একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক পাঠদান থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
শুধু শিক্ষক নয়, বিদ্যালয়ে রয়েছে সহায়ক কর্মচারীরও সংকট। পিয়ন, অফিস সহকারী, নিরাপত্তাপ্রহরী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় দৈনন্দিন প্রশাসনিক ও সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনাতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রীদের মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষক সংকটের কারণে আমাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। পাঠদানের পাশাপাশি বিভিন্ন দাপ্তরিক দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে। এমনকি বিদ্যালয়ে আয়া, পিয়ন ও নিরাপত্তাকর্মী পর্যন্ত নেই। এতে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সানজিদা বলেন, আমাদের ইংরেজি, গণিত ও আইসিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক প্রয়োজন। এসব বিষয়ে অনেক সময় বুঝতে সমস্যা হয়। বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলে প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে শেখার সুযোগ পেতাম। আমরা চাই, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হোক।
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আফিয়া তাহসিন বলেন, আমরা ভালোভাবে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে ভালো ফলাফল করতে চাই। কিন্তু সব বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় অনেক সময় পড়া বুঝতে সমস্যা হয়। বিশেষ করে কঠিন বিষয়গুলো ভালোভাবে বোঝার জন্য নিয়মিত শিক্ষক প্রয়োজন।’
মোহনপুর উপজেলা অতিরিক্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু জাফর বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের শুরুতে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত পদ সৃষ্টি না হওয়ায় শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি পদ সৃষ্টি না হলে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা দেওয়ারও সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে জেলা পর্যায়ের সভায় আলোচনা করেছি।’
মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, মোহনপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আপাতত ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় কিছু শিক্ষক রাখার চেষ্টা করব। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ জানানো হবে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ, নেতৃত্বগুণ ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধিতেও বিদ্যালয়টির রয়েছে বিভিন্ন কার্যক্রম। সক্রিয় গার্ল গাইড দল, জাতীয় দিবস উদযাপন, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, কবিতা আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছাত্রীদের মেধা ও মনন বিকাশে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। শিক্ষক সংকটের মধ্যেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সাফল্য বিদ্যালয়টির সম্ভাবনাকে তুলে ধরছে।
বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের দাবি, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শ্রেণি কার্যক্রম ও বর্তমান শিক্ষার চাহিদা বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। এ জন্য একজন প্রধান শিক্ষক ও ২১ জন সহকারী শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কর্মচারী নিয়োগের দাবি জানানো হয়েছে। তাঁদের মতে, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হলে পাঠদানের মানোন্নয়নের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমেও গতি ফিরবে।
নারী শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা প্রতিষ্ঠানটির অর্জিত সাফল্য ধরে রাখতে শিক্ষক ও কর্মচারী সংকটের সমাধান এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি ও জনবল নিয়োগে কার্যকর উদ্যোগ নেবে—এমন প্রত্যাশা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।



