
রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতির মৃত্যুতে সাংবাদিক অঙ্গনে শোক
রাজশাহীর সাংবাদিকতা অঙ্গনে দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ, রাজশাহী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদের সভাপতি সাইদুর রহমান আর নেই। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

কিডনি রোগজনিত জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন প্রবীণ এই সাংবাদিক। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।
সাইদুর রহমানের মৃত্যুতে রাজশাহীর সাংবাদিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু একজন প্রবীণ সাংবাদিক নন; ইতিহাস-ঐতিহ্য, জনকল্যাণ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একজন মানুষ।
ঐতিহ্যবাহী পরিবারের উত্তরসূরি
সাইদুর রহমান ছিলেন রাজশাহীর একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবারের উত্তরসূরি। তাঁর নানা ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী ও জননেতা মাদার বখশ। রাজশাহীতে উচ্চশিক্ষার প্রসারে মাদার বখশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও বাস্তবায়নেও তাঁর অবদানের কথা সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর বাবা জননেতা আতাউর রহমানও ছিলেন রাজশাহীর রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় তিনি নির্বাচিত হন। তাঁর মা ভাষাসৈনিক মনোয়ারা রহমান ছিলেন সমাজসেবায় নিবেদিতপ্রাণ ও আত্মত্যাগী নারী।
এই পারিবারিক ঐতিহ্যকে শুধু স্মৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি সাইদুর রহমান। সাংবাদিকতার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন তিনি।
সম্পত্তি মানুষের কল্যাণে
সাইদুর রহমানের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর সম্পদকে জনকল্যাণে ব্যবহারের উদ্যোগ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিজের প্রায় সমুদয় সম্পত্তি সমাজসেবামূলক কাজে ব্যয় করার উদ্দেশ্যে তিনি ‘জননেতা আতাউর রহমান ট্রাস্ট’ গঠন করেন এবং সম্পত্তি ট্রাস্টের নামে দলিল করে দেন।
ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন তাঁর ছোট বোন ও জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরফিন কনকের মা খেলনা আপা। সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন জননেতা আতাউর রহমান স্মৃতি পরিষদের উপদেষ্টা মাসুদ রানা সরকার।
ব্যক্তিগত সম্পদকে ভোগের পরিবর্তে মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের এ উদ্যোগ সাইদুর রহমানের জীবনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ও মানুষের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার মানসিকতার কারণে তিনি সহকর্মী ও পরিচিতজনদের কাছে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছিলেন।
সাংবাদিকদের অভিভাবকসুলভ ছিলেন
রাজশাহীর সাংবাদিক অঙ্গনে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় ছিলেন সাইদুর রহমান। সহকর্মীদের অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন অভিভাবকসুলভ। বিশেষ করে নবীন সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। পেশাগত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া, সংবাদকর্মীদের বিভিন্ন সংকটে পাশে দাঁড়ানো এবং সাংবাদিক সমাজের স্বার্থে ভূমিকা রাখার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যম অঙ্গনে পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য মুখ ছিলেন।
তাঁর মৃত্যু তাই কেবল একজন প্রবীণ সাংবাদিককে হারানোর ঘটনা নয়; রাজশাহীর সাংবাদিকতা অঙ্গনে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব ও অভিভাবকত্বের একটি অধ্যায়েরও অবসান ঘটল।
রাজশাহী জননেতা আতাউর রহমান ট্রাস্ট ও রাজশাহী প্রেসক্লাবের অর্থ সম্পাদক আল আমিন বলেন, ‘সাইদুর রহমান ভাই ছিলেন আমাদের অভিভাবকতুল্য একজন মানুষ। তাঁর মৃত্যুতে আমরা একজন প্রবীণ সাংবাদিকের পাশাপাশি একজন মানবিক ও সমাজসেবী মানুষকে হারালাম। তাঁর শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও জনকল্যাণের উদ্যোগগুলোই আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।’
রেখে গেলেন জনকল্যাণের উত্তরাধিকার
সাংবাদিকতা জীবনের ব্যস্ততা, পারিবারিক ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত অর্জনের বাইরে মানুষের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার যে প্রত্যয় সাইদুর রহমান ধারণ করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর সেটিই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সহকর্মীদের মতে, সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি নিজের সম্পদও মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন, সেটি তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানবিক উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে।
সাইদুর রহমানের মৃত্যুতে রাজশাহীর সাংবাদিক সমাজ হারাল তাদের একজন প্রবীণ সহকর্মী ও অভিভাবককে। একই সঙ্গে জনকল্যাণের যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি ‘জননেতা আতাউর রহমান ট্রাস্ট’-এর মাধ্যমে নিজের সম্পদ মানুষের জন্য রেখে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন, সেই উদ্যোগ তাঁর স্মৃতি ও আদর্শকে দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাঁর মৃত্যুতে রাজশাহীর সাংবাদিক সমাজসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন।


