
টোকিওর সঙ্গে সম্পর্কের নতুন উচ্চতা, বেইজিংয়ের সঙ্গে সহযোগিতা এবং দিল্লির সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে ঢাকার সামনে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পররাষ্ট্রনীতিতে নিজস্ব অবস্থান সুসংহত করা। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের কাছে প্রত্যাশাও বেড়েছে। এমন এক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। এ সফর কেবল কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর কিংবা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বাধীন অবস্থান ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

জনগণের রায়ে নির্বাচিত সরকারের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, শক্তিশালী শিল্প খাত এবং নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি বৈশ্বিক শক্তিগুলোর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে না পড়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন জরুরি।
এ ক্ষেত্রে জাপানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন থেকে শুরু করে মেট্রোরেল, ঢাকার বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানের অবদান অনস্বীকার্য। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠকে স্বাক্ষরিত ‘বিগ-বি’ প্রকল্প বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে সম্ভাব্য এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দেশের শুল্কব্যবস্থা, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
টোকিওর সঙ্গে সম্পর্কের এই নতুন উচ্চতা বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বে কোনো টানাপোড়েন তৈরি করার কারণ নেই। চলতি বছরের জুনে চীনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার চুক্তিগুলোও দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হলো, দেশের অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের সক্ষমতা বাড়লে সব দেশের বিনিয়োগকারীই এর সুফল পাবেন। চীনা সরঞ্জাম, জাপানি শিল্পপ্রযুক্তি এবং বাংলাদেশের উদীয়মান উদ্যোক্তাদের সমন্বয় দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে পারে।
অন্যদিকে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়া এবং দেশটির ভূখণ্ড থেকে তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তবে দুই দেশের সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। স্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে দুই দেশের জনগণের মধ্যে। সমতা, পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সেই সম্পর্ক পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি।
বিগত ১৭ বছর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ভারতের প্রতি যেভাবে অতিরিক্ত ঝুঁকে ছিল বলে সমালোচনা রয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পররাষ্ট্রনীতির এই পুনর্বিন্যাস যেন কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা তৈরির উপলক্ষ না হয়। বরং জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক মর্যাদাকে ভিত্তি করেই প্রতিটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া বর্তমান সরকারের বড় দায়িত্ব হলো আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। নতুন প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ব্যয়, ঋণের দায়, অর্থনৈতিক সুফল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু নতুন প্রকল্পের ঘোষণা নয়, বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
জাপানের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে। কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই হতে পারে দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি। শেষ পর্যন্ত কূটনীতির সাফল্য চুক্তির সংখ্যা কিংবা বিনিয়োগের অঙ্কে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনে তার ইতিবাচক প্রভাব কতটা পড়ল, তার ওপরই নির্ভর করবে।
সূত্রঃ সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনূদিত।


