
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ইরান। তবে এই কড়াকড়ির মধ্যেও ভারত, চীন, কাতার ও ইরাককে বিশেষ সুবিধা ও ছাড় দিচ্ছে তেহরান। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই চারটি দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে। এই সুবিধার বিনিময়ে তেহরান সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন এবং সম্ভাব্য বড় অঙ্কের ট্রানজিট রাজস্ব সুবিধা নিশ্চিত করছে। তবে মার্কিন নৌ-অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখে এই ছাড় কতটা টেকসই ও কার্যকর হবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে গভীর সংশয় রয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক স্থায়ী কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দাম দেশটির সংবাদ সংস্থা আইএসএনএকে (ISNA) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে ভারত, চীন, কাতার ও ইরাকের জাহাজগুলো অবাধে যাতায়াত করছে এবং বর্তমানে মার্কিন বাহিনীও এসব দেশের জাহাজে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে না।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান কৌশলগত এই আন্তর্জাতিক নৌপথটি কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলে। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও সংঘাতপূর্ণ রূপ নিলে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোকে কেন্দ্র করে আবারও পাল্টা নৌ-অবরোধ আরোপ করে ওয়াশিংটন। এমন তীব্র সামরিক উত্তেজনার ভেতরে নির্দিষ্ট চারটি দেশকে ইরানের এই বিশেষ ছাড় দেওয়ার ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এর বাস্তব কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ছাড়ের বিনিময়ে তেহরানের স্বার্থ
হায়াত মুকাদ্দামের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে ইরান সরাসরি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা আদায় করছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত থেকে জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ এবং বেইজিংয়ের কাছ থেকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃঢ় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পাচ্ছে তেহরান। অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ কাতার সংঘাত নিরসনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়ে তিনি জানান, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের জন্য ভারতীয় ও চীনা পণ্যবাহী জাহাজ থেকে নির্দিষ্ট হারে নিরাপত্তা ও পরিবহন মাশুল আদায় করা হবে। তবে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকার কারণে কাতারের বাণিজ্যিক নৌযানগুলোকে সম্পূর্ণ বিনাশুল্কে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক মাশুল আরোপ করা হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রুজবেহ পারসি এ প্রসঙ্গে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা ইরানের জন্য পণ্য বিনিময় (বার্টার সিস্টেম) কিংবা পরোক্ষ সুবিধা নেওয়া নতুন কোনো কৌশল নয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি কেবল রাজস্ব আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি নিষেধাজ্ঞার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখার সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক চাল।
চার দেশের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব
বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি ট্রানজিট পথ হরমুজ প্রণালির ওপর এই চারটি দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নির্ভরতা অত্যন্ত গভীর। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলারের (Kpler) দেওয়া তথ্য অনুসারে, সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী দৈনিক প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের বড় অংশই যায় এশিয়ায়। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ তেল যায় চীনে এবং প্রায় ১৩ শতাংশ যায় ভারতে।
বিশ্লেষক রুজবেহ পারসির মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সরবরাহ বিঘ্নিত হলে ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতি তীব্র জ্বালানি সংকটে পড়তে বাধ্য। অন্যদিকে, ইরান যেসব অত্যাধুনিক ওষুধ নিজস্ব গবেষণাগারে তৈরি করতে পারে না, ভারত সেগুলোর অন্যতম শীর্ষ উৎপাদক। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ওষুধ বা চিকিৎসাসামগ্রী বিনিময়ের মাধ্যমে উভয় দেশের জন্য একটি দ্বিপক্ষীয় বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে।
একই সময়ে কাতারও তাদের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির বিকল্প পথ না থাকায় এই প্রণালির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। সামরিক অস্থিরতার শুরুতে সাময়িকভাবে কাতারি এলএনজি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি প্রণালিটি দিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস বিশ্ববাজারে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। একই সমীকরণে যুদ্ধকালীন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে ইরাকও তাদের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বাড়াতে প্রণালিটির নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে চাইছে।
ওয়াশিংটনের অবরোধ ও কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা
এই ছাড়ের ফলে চার দেশ সাময়িক স্বস্তি পেলেও তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার দ্বিমুখী অবস্থান দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের সঙ্গেই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করে চলা ভারত ও কাতারের জন্য এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়।
এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছে, তাদের নৌ-অবরোধ মূলত ইরানের মূল ভূখণ্ডের বন্দর ও উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবেশকারী বা সেখান থেকে বের হওয়া সমস্ত জাহাজের ওপর প্রযোজ্য। তবে যেসব জাহাজ ইরানের কোনো বন্দরে না ভিড়ে শুধু আন্তর্জাতিক জলপথ ব্যবহার করে উপসাগরীয় অন্যান্য দেশে যাতায়াত করছে, সেগুলো এই অবরোধের আওতাভুক্ত নয়। এছাড়া খাদ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মতো জরুরি মানবিক পণ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তল্লাশির পর চলাচলের অনুমতি পেতে পারে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি এই ছাড়কে কেবল আঞ্চলিক বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের নিজস্ব আমদানি-রপ্তানির জাহাজেও সম্প্রসারিত করে, তবে মার্কিন অবরোধ কার্যকারিতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া মেনে নেবে কি না, কিংবা সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের জাতীয় পতাকা, মূল মালিকানা অথবা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের ভিত্তিতে মার্কিন নৌবাহিনী কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেবে কি না—তা এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে হরমুজ প্রণালিতে এই সাময়িক সুবিধা বড় কোনো সংঘাত ছাড়া কতদিন বজায় থাকবে, তা নিয়ে গভীর ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।


