
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারের ওপর ঐক্যবদ্ধ ও অব্যাহত কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাঁদের আশ্রয়দাতা বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় সমর্থন অব্যাহত রাখতে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন উপলক্ষে নিউইয়র্কে ওআইসির রোহিঙ্গাবিষয়ক কন্টাক্ট গ্রুপের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যে এসব আহ্বান জানানো হয়। ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ওআইসি কন্টাক্ট গ্রুপও রোহিঙ্গাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানিয়েছে।
বাংলাদেশের বক্তব্যে বলা হয়, প্রায় এক দশক ধরে সীমিত সম্পদের মধ্যেও বিপুলসংখ্যক জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। সরকারি হিসাবে দেশে ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
জাতিসংঘ ও অংশীদারদের ২০২৬ সালের হালনাগাদ যৌথ সাড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে এসেছে এবং ২০২৬ সালে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বক্তব্যে বলা হয়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিশু জন্ম নেওয়ায় সংকটটি ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। ফলে এটি শুধু মানবিক সংকটে সীমাবদ্ধ নেই; আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
অনিয়মিত সমুদ্রযাত্রা, মানবপাচার ও মাদকপাচারসহ আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, এসব ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি নিষ্ক্রিয়তার পরিবর্তে কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বক্তব্যে আবারও স্পষ্ট করা হয়, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও সেখানে। তাই রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের লক্ষ্য।
জাতিসংঘে বাংলাদেশ এর আগে একই অবস্থান তুলে ধরে বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
ওআইসির ২০২৬-২০৩৫ মেয়াদের কর্মপরিকল্পনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। তবে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্ব ভাগাভাগি ও সহায়তা আরও জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।
৭১ কোটি ৫ লাখ ডলারের প্রয়োজন
২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীসহ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে সহায়তার লক্ষ্যে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন। এই আবেদন ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। জাতিসংঘ বলছে, অর্থের পরিমাণ কমানোর অর্থ প্রয়োজন কমে যাওয়া নয়; বরং বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার সংকটের মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক ন্যূনতম জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রম চালু রাখার জন্য পরিকল্পনাটি পুনর্গঠন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওআইসি সদস্য দেশগুলোর কাছে জরুরি, পূর্বানুমেয় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় এক দশক ধরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও আন্তর্জাতিক সহায়তার আওতায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা সাড়াদানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রায় ৫৪২ কোটি ডলার মানবিক সহায়তা দিয়েছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে নতুন করে অর্থায়নের প্রয়োজন অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহিতে জোর
রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াকেও গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলায় ওআইসি সদস্য দেশগুলোর কূটনৈতিক ও আর্থিক সহায়তার প্রশংসা করা হয়।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রোহিঙ্গা সংকটসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তার জন্য সম্প্রতি ওআইসি তহবিলে প্রায় ১৩ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাউন্সিলের বৈঠকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার প্রত্যাশা জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের বক্তব্যে বলা হয়, জবাবদিহি শুধু অতীতের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বিষয় নয়; ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা পুনরায় ঠেকাতেও এর ভূমিকা রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বিচার ও জবাবদিহির ব্যবস্থায় ওআইসির সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়।
তিন অগ্রাধিকার
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক তিনটি অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। এগুলো হলো—জাতিসংঘ ও আসিয়ানের সঙ্গে সমন্বয় করে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা, ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে জরুরি ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করা।
এদিকে, নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ওআইসি কন্টাক্ট গ্রুপের বৈঠকে সংস্থাটির পক্ষ থেকেও মিয়ানমারকে সংকটের মূল কারণ মোকাবিলা, রোহিঙ্গাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রায় এক দশক ধরে চলা রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য নিয়মিত অগ্রাধিকার হিসেবে ধরে রাখার ওপরও জোর দিয়েছে বাংলাদেশ। বক্তব্যে বলা হয়, মানবিক ক্লান্তি যেন রাজনৈতিক উদাসীনতায় রূপ না নেয়। রোহিঙ্গাদের শুধু আশ্রয়ে টিকে থাকার সুযোগ নয়, নিজেদের ভূমিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের লক্ষ্য।


