
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেত থেকে উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন (১৪) হত্যার রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় সুমন নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, তাজমিনকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে অন্য পথে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ এবং পরে শ্বাসরোধে হত্যার কথা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন সুমন।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে তাজমিনকে কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য সুমনের অটোরিকশা ভাড়া করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে না গিয়ে তিনি তাকে অন্য পথে নিয়ে যান। পরে দীর্ঘ সময় বিভিন্ন স্থানে ঘোরানোর পর লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি নির্জন সড়কে নিয়ে যান।
পুলিশ জানায়, সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হলে তাঁর সঙ্গে সুমনের ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে অটোরিকশাটি ধানখেতে কাত হয়ে পড়ে যায়। তাজমিন সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করলেও সুমন তাঁকে ধরে ফেলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পরে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের ভাষ্য।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, হত্যার পর সুমন ঘটনাস্থল ছেড়ে পাশের এলাকার একটি পুকুরে গোসল করেন। এ সময় তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে যান তিনি। পরে ফোনটি একটি ধানখেতে লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামের দিকে চলে যান।
ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন নম্বরের সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল চট্টগ্রাম নগরীর একটি এলাকা থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। আদালতে জবানবন্দি দেবেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আদালতে তোলার পর বিষয়টি বোঝা যাবে।
সংবাদ সম্মেলনে লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান, গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পবিত্র সরকার, উপপরিদর্শক অর্ণবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়াতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সে আর বিদ্যালয়ে যাচ্ছিল না।
তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা রিজিয়নে কর্মরত। পরিবারের সদস্যরা কুমিল্লা নগরের রেসকোর্স এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত ১২টা ১৯ মিনিটে তাকে সর্বশেষ কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা যায়।
পরে রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে একটি বার্তা পাঠায় তাজমিন। তবে সে সময় ঘুমিয়ে থাকায় বাবা বার্তাটি দেখতে পাননি।
পরদিন সকালে অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশাটি জব্দ করা হয়।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সুমনকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলছে। মামলার তদন্তের পরবর্তী ধাপে অন্যান্য আলামত ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাই করা হবে।


