
মৌসুমী দাস, চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধিঃ রাজশাহীর চারঘাটে রাতের আঁধারে কেটে নেওয়া হচ্ছে সরকারি গাছ। গ্রামীণ সড়কের পাশের গাছের পর এবার পদ্মা-বড়াল নদীর তীর রক্ষা বাঁধের গাছও রেহাই পাচ্ছে না। সংঘবদ্ধ চক্রটি চেইনসো দিয়ে কয়েক মিনিটেই বড় গাছ কেটে মিনি ট্রাক ও ভ্যানে করে নিয়ে যাচ্ছে। পরে এসব গাছ পৌঁছে যাচ্ছে এলাকার বিভিন্ন অবৈধ করাতকলে। গত দুই বছরে অন্তত পাঁচ হাজার গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ করেছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো।
অথচ গাছ কাটার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো দপ্তর থানায় অভিযোগ করেনি। বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) মধ্যে চলছে দায় এড়ানোর চেষ্টা। এর মধ্যেই উপজেলা বন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। তিনি পাঁচ বছর ধরে নিজ উপজেলায় কর্মরত থাকায় গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

উপজেলা বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চারঘাটের বিভিন্ন সড়ক ও নদীর তীরের প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকায় সামাজিক বনায়নের প্রায় এক লাখ গাছ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সড়কে এলজিইডি ও বিএমডিএর লাগানো গাছ রয়েছে প্রায় ২০ হাজার। এসব গাছের বয়স পাঁচ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে।
জানা যায়, ২০০৯ সালে বড়াল নদীর উৎসমুখ খনন করা হয়। পরের বছর খননকাজ শেষ হলে পদ্মা ও বড়াল নদীর মোহনায় খয়ের, মেহগনি, কড়ইসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাঁচ হাজারের বেশি গাছ লাগানো হয়। নদীর তীরবর্তী বিজিবি ক্যাম্প, চারঘাট থানা, উপজেলা পরিষদ ও আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ভাঙনের ঝুঁকি থেকে রক্ষার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখাই ছিল বনায়নের উদ্দেশ্য। ১৫ বছরের বেশি বয়সী এসব গাছের কয়েকটি আগে নদীভাঙনের অজুহাতে কেটে নেওয়া হয়। কিন্তু এখন রাতের আঁধারে এই বনায়নের একের পর এক বড় গাছ উধাও হচ্ছে।
রবি ও সোমবার সরেজমিন পদ্মা-বড়াল নদীর মোহনায় গিয়ে গাছের গুঁড়ি পড়ে থাকতে দেখা গেছে। দেখা গেছে, গাছ পরিবহনের যানবাহনের চিহ্নও। স্থানীয় কৃষক মোক্তার হোসেন বলেন, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর নদীভাঙনের অজুহাতে কিছু গাছ কাটা হয়েছিল। এখন রাত হলেই একটি চক্র এসে বড় বড় গাছ কেটে নিয়ে যায়। সেখানে সামাজিক বনায়ন সমিতি থাকলেও কেউ প্রতিবাদ করছে না। বন বিভাগের লোকজনও দেখতে আসেন না।
পদ্মা-বড়াল মোহনার সামাজিক বনায়ন সমিতির সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, রাতের আঁধারে যারা গাছ কাটতে আসে, তাদের কাছে দেশীয় অস্ত্র থাকে। ভয়ে কেউ কাছে যাওয়ার সাহস পায় না। তবে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বন বিভাগকে অবহিত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগে বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কের পাশের সরকারি গাছ নিজেদের লাগানো দাবি করে কেটে নেওয়া শুরু হয়। ভায়ালক্ষীপুর ইউনিয়নের বাঁকড়া বাজার-রায়পুর প্রধান সড়কের পাশে লাখ টাকা মূল্যের বড় বড় মেহগনি গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। এদিকে হাবিবপুর থেকে মৌলভাগ হয়ে বাসুদেবপুর পর্যন্ত নবনির্মিত সড়ক প্রশস্ত করার কাজ শুরুর সময় দরপত্র ছাড়াই প্রায় ৩০০ গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি চক্রের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

শিক্ষক সেলিম রেজা বলেন, সড়ক প্রশস্ত করার নামে দিনের বেলায় চোখের সামনে শত শত গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। অথচ বন বিভাগ বা প্রশাসনের কেউ বাধা দিতে আসেননি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অবহেলায় গাছগুলো ধ্বংস হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গাছ কাটার চক্রটি সাধারণত রাত ১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। আগে থেকেই গাছ চিহ্নিত করে কয়েকজন মিলে চেইনসো দিয়ে পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যে একটি গাছ কেটে ফেলে তারা। এরপর ছোট ট্রাক বা ভ্যানে করে গাছ নিয়ে যাওয়া হয় আশপাশের করাতকলে। সেখানে দ্রুত গাছ টুকরো করা হয়। ফলে পরে গাছের উৎস শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
উপজেলা বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চারঘাটে ৩৮টি করাতকল রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অনুমোদন রয়েছে মাত্র ১৩টির। বাকি ২৫টি করাতকল অনুমোদন ছাড়াই চলছে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অবৈধ করাতকলের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় চোরাই গাছের বেচাকেনা সহজ হচ্ছে। বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
উপজেলার নিমপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, রাস্তার পাশের পুরোনো সরকারি গাছগুলো নিয়ম মেনে দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করে সেখানে নতুন গাছ লাগানো উচিত। এতে সরকার রাজস্ব পাবে। অন্যথায় প্রতিদিন দুই-চারটি করে গাছ কাটতে থাকলে একসময় রাস্তার দুই পাশ ফাঁকা হয়ে যাবে। অথচ কোনো দপ্তরই আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, উপজেলা বন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান পাঁচ বছর ধরে নিজ উপজেলায় কর্মরত। তাঁর বাড়ি চারঘাটের টাঙ্গন এলাকায়। নিজ এলাকায় দীর্ঘদিন চাকরি করার কারণে গাছ কাটা ও অবৈধ করাতকলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন বলে তাঁদের অভিযোগ। কারণ অধিকাংশ অপরাধীই নিজ এলাকার পরিচিত মুখ।
তাঁরা আরও বলেন, বন কর্মকর্তা প্রায়ই অফিসে থাকেন না। এ সুযোগে বন বিভাগের কার্যালয়ের নবনির্মিত প্রাচীরের লোহার গ্রিলও চুরি গেছে। এ ঘটনায়ও থানায় লিখিত অভিযোগ বা মামলাও করেন তিনি। গাছ রক্ষার চেয়ে বন বিভাগের কার্যালয়ে চারা উৎপাদন করে বিক্রি করে আয় করে আয় করতে তাঁর বেশি মনোযোগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ভয়েসের চারঘাট উপজেলা শাখার আহ্বায়ক শাহাদাতুজ্জামান রিমন বলেন, পদ্মা-বড়াল মোহনার বনায়ন স্থানীয় মানুষের কাছে ‘মিনি সুন্দরবন’ নামে পরিচিত। সেখানকার গাছ কেটে ফেলায় সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি নদীর তীর ভাঙনের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। গাছ রক্ষায় বন বিভাগের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চারঘাট উপজেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সজীব ইসলাম বলেন, এসব গাছ কাটার ফলে গ্রামীণ অবকাঠামো ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। তাঁর অভিযোগ, বন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমানের স্বজনপ্রীতির কারণে হাজারো গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গাছ রক্ষায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে চারা বিক্রিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এই কর্মকর্তা।
এদিকে চারঘাট উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, সড়কের পাশের অধিকাংশ গাছ বন বিভাগের। কিছু সড়কের পাশে এলজিইডির গাছ রয়েছে। সেগুলোর বিষয়ে তাঁরা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা বন কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান বলেন, পদ্মা-বড়াল নদীর সংযোগস্থলের গাছ কাটার বিষয়টি তিনি অবগত হয়েছেন। সপ্তাহখানেকের মধ্যে এ ঘটনায় মামলা করা হবে। নিজ উপজেলায় চাকরি করেন বলে কাউকে ছাড় দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। অফিসে না থাকলেও বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে বাইরে থাকতে হয় বলে জানান তিনি।


