
ইসলাম ও জীবন ডেস্কঃ ব্যস্ত নাগরিক জীবনে সময়ের পেছনে অবিরাম ছুটতে গিয়ে নিজের যত্ন নেওয়ার বিষয়টি প্রায়ই সবার অলক্ষে চলে যায়। দৈনন্দিন কাজের ফিরিস্তি শেষ করতে গিয়ে দিনের শেষে দেখা যায়, দেহ ও মনের খোঁজ নেওয়ার মতো ফুরসত আর মিলছে না। অন্যের সেবা কিংবা দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের প্রতি এই অবহেলা দীর্ঘমেয়াদে শরীর ও মনে ডেকে আনে গভীর অবসাদ। অথচ ইসলাম কেবল আধ্যাত্মিক ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি এমন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যেখানে শরীর, মন ও আত্মার যথাযথ পরিচর্যাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একটি চারাগাছ যেমন পর্যাপ্ত রোদ ও পানি ছাড়া টিকতে পারে না, মানবজীবনও তেমনি মন, শরীর ও আত্মার ত্রিমুখী যত্ন ছাড়া সতেজ থাকতে পারে না। এই রূপান্তরের জন্য প্রতিদিন নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে—‘আজ আমি আমার মন, শরীর এবং আত্মার জন্য কী করেছি?’ দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তি ফেরাতে সহায়ক এমন ১২টি অভ্যাস তুলে ধরা হলো:

মনের সুস্থতায়
১. ডায়েরি বা জার্নাল লেখা
দিনের প্রাপ্তি, ব্যর্থতা ও আত্মোপলব্ধির কথা লিখে রাখা মনকে ভারমুক্ত করার দারুণ মাধ্যম। বিশেষ করে প্রতিদিন আল্লাহর অশেষ নিয়ামতের কথা স্মরণ করে ডায়েরিতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস মানসিক প্রশান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
২. মেধা ও জ্ঞানের চর্চা
জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর আবশ্যকীয় দায়িত্ব। নিয়মিত নতুন কোনো বিষয় শেখা, গবেষণাধর্মী বই পড়া কিংবা নতুন ভাষা আয়ত্তের মাধ্যমে মেধা চর্চা করলে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকে এবং মানসিক জড়তা কাটে।
৩. ইতিবাচক ও ভালো সঙ্গ
মন-মানসিকতা গঠনে বন্ধু ও পারিপার্শ্বিক সঙ্গের প্রভাব অপরিসীম। সৎ ও নীতিবান মানুষের সাহচর্যে সময় কাটালে চিন্তায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য রক্ষা করা আত্মিক স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য।
৪. ক্ষোভ পরিহার ও ইতিবাচক মনোভাব
অন্যের ভুলের জন্য মনে ক্ষোভ পুষে না রেখে ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা অন্তরকে হালকা করে। ইসলামে সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতাকে সর্বোচ্চ মানসিক শক্তির পরিচায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শরীরের যত্নে
৫. প্রতিদিন দ্রুত হাঁটা
শারীরিক জড়তা দূর করতে এবং হৃদযন্ত্র সচল রাখতে প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটার বিকল্প নেই। একটি সবল ও কর্মক্ষম দেহ সুন্দরভাবে ইবাদত পালনেও সরাসরি সহায়তা করে।
৬. হালকা ব্যায়াম ও স্ট্রেচিং
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর অথবা কাজের বিরতিতে শরীর স্ট্রেচিং বা হালকা ব্যায়াম করা উচিত। এতে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে এবং মাংসপেশির ক্লান্তি কেটে শরীর সারাদিন চনমনে থাকে।
৭. সময়মতো পরিমিত ঘুম
শারীরিক সুস্থতার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো পরিমিত ও গভীর ঘুম। রাতের প্রথম প্রহরে দ্রুত ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস শরীরকে রোগমুক্ত রাখে এবং ফজরের সালাতে সময়মতো জাগ্রত হতে সহায়তা করে।
৮. সচেতন ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস
পেট ভরে অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের চেয়ে সুষম ও পরিমিত খাদ্য গ্রহণই সুস্বাস্থ্যের মূলভিত্তি। খাদ্যতালিকায় নিয়মিত পর্যাপ্ত ফলমূল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার রাখা শরীরকে দীর্ঘমেয়াদে প্রাণবন্ত রাখে।
৯. পর্যাপ্ত পানি পান
শরীরে পানির সামান্য ঘাটতিও ক্লান্তি ও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। তাই দিনজুড়ে নিয়ম মেনে পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করা উচিত, যা দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সুস্থ রাখতে সহায়ক।
আত্মার প্রশান্তিতে
১০. সময়মতো সালাত আদায়
জীবনের যাবতীয় ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে ঠিক সময়ে সালাত আদায় আত্মাকে সতেজ করে তোলে। সালাতে সিজদার মুহূর্তগুলো মনের গভীর উদ্বেগ ও অস্থিরতা দূর করে অনাবিল মানসিক স্থিরতা দান করে।
১১. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত
কুরআনুল কারিম কেবল জীবনবিধানই নয়, অন্তরের ব্যাধির মহৌষধ। প্রতিদিন অর্থ বুঝে অন্তত কিছু সময় কুরআন অধ্যয়ন ও তিলাওয়াত করলে মানসিক অশান্তি দূর হয় এবং অন্তরে গভীর প্রশান্তি নেমে আসে।
১২. আল্লাহর জিকির ও দোয়া
সারাদিনের কাজের মাঝে জিহ্বাকে আল্লাহর স্মরণে ও জিকিরে সিক্ত রাখা অন্তরের কলুষতা দূর করে। নিয়মিত ইস্তিগফার ও জিকির মানুষকে যেকোনো ধরনের মানসিক হতাশা থেকে দূরে রাখে।
দৈনন্দিন অভ্যাসে এই বিষয়গুলোর সমন্বয় ঘটালে কর্মব্যস্ততার মধ্যেও শরীর থাকবে নিরোগ, মন থাকবে প্রফুল্ল এবং আত্মা থাকবে প্রশান্ত।


