
একসময় প্রতিষ্ঠানের সীমানাপ্রাচীর ঘেঁষে বসত বখাটেদের আড্ডা। শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করা, ধূমপানসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডে উদ্বেগে থাকতেন শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা। এর সঙ্গে ছিল শিক্ষক-কর্মচারীদের সময়ানুবর্তিতা ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ। তবে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে রাজশাহীর পবা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজে। নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও পাঠদানের পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া ধারাবাহিক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শিক্ষকদের সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে চালু হয়েছে ফিঙ্গারপ্রিন্টভিত্তিক হাজিরা ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতেও একই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত অনুপস্থিত থাকলে মোবাইল ফোনে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কারণ জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদানে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, পরামর্শ কিংবা সমস্যার কথা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে স্থাপন করা হয়েছে অভিযোগ বক্স। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া হয়েছে বিনামূল্যের আইডি কার্ডও।
নিরাপত্তা আরও জোরদারে আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ভেতর ও বাইরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত এবং যানবাহন রাখার সুবিধায় গ্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
শুধু নিরাপত্তা নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে উদ্যোগ। বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে আলাদাভাবে পাঠদান করা হচ্ছে। পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মো. জেকের আলী বলেন, শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে আমরা নিয়মিত কাজ করছি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান বাড়ানো এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী শামীমা খাতুন বলেন, আগের তুলনায় এখন বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনেক ভালো। নিরাপদে আসা-যাওয়া করতে পারছি। শিক্ষকরা ক্লাসে নিয়মিত থাকার বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে।
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুকাইয়া আক্তার ইমি বলেন, বিদ্যালয়ের সামনে বখাটেদের আড্ডা বা মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার মতো বিষয় এখন অনেক কমেছে। নিরাপত্তা বাড়ায় স্বস্তিতে বিদ্যালয়ে আসতে পারছি। পড়াশোনায়ও মনোযোগ বেড়েছে।
প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নেও উদ্যোগ নিয়েছেন গভর্নিং বডির সভাপতি কে এইচ রানা শেখ। তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলেজ শাখায় ১৫টি চেয়ার ও একটি পানির মোটর দেওয়া হয়েছে।
গভর্নিং বডির সভাপতি কে এইচ রানা শেখ বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও সুন্দর পরিবেশে লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। বখাটেপনা ও বহিরাগতদের অনাকাঙ্ক্ষিত উপস্থিতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগামী এক মাসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সিসিটিভি স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের লক্ষ্য বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজকে রাজশাহী বিভাগের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং পাঠদানের মান নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশাসনের সহযোগিতা ও নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল হক মিলন বলেন, বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার মান উন্নয়নে আমি সার্বিক সহযোগিতা করব। শিক্ষার্থীদের জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তারাই ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজের নেতৃত্ব দেবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবর্তন শুধু অবকাঠামো দিয়ে হয় না। প্রয়োজন প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, মানসম্মত পাঠদান, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং নিরাপদ পরিবেশ। বড়গাছি স্কুল অ্যান্ড কলেজে নেওয়া উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি পবার গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজশাহীতে একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।


