
বরজজুড়ে সারি সারি পানগাছ। পাতার ফাঁকে ফাঁকে সবুজের সমারোহ। ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় পান তোলার ব্যস্ততা। বরজ থেকে পান সংগ্রহ করে কৃষকেরা ছুটছেন স্থানীয় হাটে। সেখান থেকে পাইকারদের হাত ধরে সেই পান পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ঝড়-বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলা করেও ভালো ফলন ও সন্তোষজনক দাম পাওয়ায় রাজশাহীর মোহনপুরের পানচাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ অর্থকরী ফসল এখন হাজারো মানুষের জীবিকা ও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
রোববার (১১ অক্টোবর) মোহনপুর উপজেলার একদিলতলা হাটে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পান নিয়ে এসেছেন। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দরদাম করে চলছে কেনাবেচা। হাট থেকে পান সংগ্রহ করে পাইকারেরা তা নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মোহনপুরে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হচ্ছে। এসব জমিতে রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৭০০ পানবরজ। উপজেলার বাকশিমইল, মৌগাছি, ধুরইল, ঘাসিগ্রাম, জাহানাবাদ ও রায়ঘাটি ইউনিয়ন এবং কেশরহাট পৌরসভা এলাকায় বিস্তৃত এসব বরজ।
পান চাষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কৃষকদের পাশাপাশি শ্রমিক, বরজ তৈরির বাঁশ-খড়ের সরবরাহকারী, পরিবহন ব্যবসায়ী ও পাইকারেরাও জীবিকা নির্বাহ করছেন। ফলে পানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্থানীয় অর্থনীতির বিস্তৃত কর্মযজ্ঞ।
মোহনপুরের মিষ্টি পান ২০২৩ সালের ৩১ আগস্ট ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ স্বীকৃতি ঐতিহ্যবাহী পানটির পরিচিতি আরও বাড়িয়েছে। স্বাদ, ঘ্রাণ ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোহনপুরের মিষ্টি পানের আলাদা কদর রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারেরা মোহনপুরের হাট-বাজারে এসে পান সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। জিআই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে পানের মান সংরক্ষণ, বাজার সম্প্রসারণ ও রপ্তানি ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে এ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পানচাষিদের হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে পান চাষের জন্য প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। নিয়মিত পরিচর্যা ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে বছরে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হতে পারে। সব ব্যয় বাদ দিয়ে নিট লাভ থাকে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। তবে জমির ধরন, উৎপাদন, রোগবালাই, শ্রমিকের মজুরি ও বাজারদরের ওপর প্রকৃত আয়-ব্যয় নির্ভর করে।
প্রথম বছর বরজ তৈরি, বাঁশের বেড়া, ছাউনি, লতা ও অন্যান্য উপকরণ কেনার পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ তুলনামূলক কমে আসে।
মোহনপুরের সইপাড়া গ্রামের পানচাষি রইচ উদ্দিন প্রায় ২৫ বছর ধরে মিষ্টি পান চাষ করছেন। দুই বিঘা জমিতে পান চাষ করে তিনি ভালো আয় করেছেন। তিনি বলেন, “পান আমাদের কাছে সোনার পাতা। প্রয়োজনের সময় বরজ থেকে পান তুলে বাজারে বিক্রি করলেই নগদ টাকা পাওয়া যায়। তবে ভালো ফলন পেতে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়।”
চাষিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আকার ও মানভেদে প্রতি বিড়া চিকন পান ২০ থেকে ৩০ টাকা, মাঝারি পান ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং বড় পান ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের পান কোথাও কোথাও আরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে হাট, পানের মান ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে দাম কমবেশি হয়।
মৌগাছিসহ উপজেলার বিভিন্ন হাট থেকে পাইকারেরা পান সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠাচ্ছেন। এতে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি পরিবহন ও পাইকারি ব্যবসায়ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে।
পাইকার ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, “চলতি মৌসুমে পানের দাম ভালো পাচ্ছি। পান সংগ্রহ করে সরাসরি ঢাকার ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠাচ্ছি। বাজারে বর্তমান দাম অব্যাহত থাকলে পানচাষিরা আরও উৎসাহিত হবেন।”
পান চাষে লাভের সম্ভাবনা থাকলেও ঝুঁকিও কম নয়। অতিরিক্ত বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, তীব্র রোদ এবং আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনে পানগাছ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বর্ষা মৌসুমে গোড়া পচাসহ বিভিন্ন রোগের আক্রমণ দেখা দেয়। পাশাপাশি বাঁশ, খড়, শ্রমিকের মজুরি, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। বাজারদর কমে গেলে চাষিদের লাভের পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
চাঁদপুর গ্রামের কৃষক আবদুল হামিদ বলেন, “পান চাষ করেই আমি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছি। তবে রোগবালাই ও আবহাওয়ার কারণে মাঝেমধ্যে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। অতিরিক্ত বৃষ্টি, বরজে পানি জমে যাওয়া এবং বিভিন্ন রোগের আক্রমণে পানগাছ নষ্ট হতে পারে। কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও রোগবালাই দমনের সহজ ব্যবস্থা থাকলে চাষিরা আরও উপকৃত হবেন।”
মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভের সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় উপজেলায় পান চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। জিআই স্বীকৃতির ফলে মোহনপুরের পানের পরিচিতিও বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোহনপুর উপজেলায় ৬০০ কোটি টাকার বেশি পানের বাণিজ্য হয়েছে। কৃষকদের মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। রোগবালাই দেখা দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।”
মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, “রাজশাহীর পান উৎপাদনের প্রায় ২৯ শতাংশ মোহনপুরে হয়। পান এখানকার অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মোহনপুরে পান গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।”
কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, জিআই স্বীকৃতিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদনের পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণ, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে আরও উন্নয়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এ খাতের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
মোহনপুরের মিষ্টি পান এখন শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়; এটি স্থানীয় কর্মসংস্থান, কৃষকের আয় ও গ্রামীণ বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাযথ পরিকল্পনা, সরকারি সহায়তা এবং বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে ঐতিহ্যবাহী এই ‘সোনার পাতা’ দেশের বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।


