
সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে আজ পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। সড়ক নিরাপত্তাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, যাত্রী ও পথচারীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মানুষের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা, নির্বিঘ্ন যাতায়াত এবং টেকসই যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে সড়ক নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য সামনে রেখে দিবসটি উপলক্ষে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ পেশাদার চালকদের স্বাস্থ্য ও চক্ষু পরীক্ষা, মাদক পরীক্ষা, সড়কের সাইন-সিগন্যাল ও রোড মার্কিং সংস্কার এবং দক্ষতার ভিত্তিতে চালকদের পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও যুবসমাজকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতামূলক প্রচার এবং ম্যারাথন আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসারে পাঁচটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো—নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কাজ করছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর জাতীয় মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলকভাবে ১৪০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কে নিরাপত্তা উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং প্রায় ৬০০ কিলোমিটার মহাসড়কে বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, পেশাদার মোটরযানচালকদের দক্ষতা বাড়াতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মাধ্যমে ৬০ হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের লক্ষ্য চালকদের দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণভাবে যানবাহন চালানো কমানো।
দুর্ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া এবং জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করাও সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতে ৪০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স ও ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা হয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছানো এবং আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে এসব যান ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া মহাসড়কে যান চলাচল পর্যবেক্ষণ, দুর্ঘটনা শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের উদ্যোগ রয়েছে। দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর আইন প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন এবং জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ গঠনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোর মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং কার্যক্রমের তদারকি জোরদার করার লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারের নির্দেশনা কার্যকর করা এবং যানবাহনের গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে স্পিড ম্যানেজমেন্ট ম্যানুয়াল প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী উভয়ের হেলমেট ব্যবহার, নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা এবং ট্রাফিক আইন অনুসরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। চালকের বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা, ট্রাফিক আইন অমান্য, যানবাহনের ত্রুটি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে সড়কের নকশাগত ত্রুটি, পর্যাপ্ত সাইন-সিগন্যালের অভাব, ফুটপাত দখল এবং দুর্বল সড়ক ব্যবস্থাপনাও নিরাপদ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে।
এ পরিস্থিতিতে চালকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পার হওয়ার ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সড়ক নিরাপত্তার কার্যক্রম শুধু দিবসকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। সারা বছর সচেতনতামূলক প্রচার, দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিতকরণ এবং গৃহীত পদক্ষেপের ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের পাশাপাশি পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, যাত্রী ও পথচারীদের সম্মিলিত দায়িত্ব। চালকদের ট্রাফিক আইন মেনে চলা, মোটরসাইকেলে চালক ও আরোহী উভয়ের হেলমেট ব্যবহার এবং পথচারীদের নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পার হওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের মূল প্রত্যাশা, সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর আইন প্রয়োগ, উন্নত অবকাঠামো ও জনসচেতনতার মাধ্যমে নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনও সারা বছর অব্যাহত রাখা জরুরি।


