
২৮ দিনে ১১ মৃত্যু, ১০ জনই ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে
প্রতিদিন গড়ে ২৫-এর বেশি নতুন রোগী
জ্বর ভেবে অবহেলা, হাসপাতালে এসেই সংকটাপন্ন; ৪৫ বেডের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে বাড়ছে রোগীর চাপ, রয়েছে নার্স সংকটও
জ্বর নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল চার বছরের শিশু মাইশা। বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মনিগ্রামে। ২৬ সেপ্টেম্বর ভোর ৫টা ৫৯ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। কিন্তু মাত্র দুই দিন পর ২৮ সেপ্টেম্বর রাত ২টা ২২ মিনিটে নিভে যায় শিশুটির প্রাণ। চিকিৎসকদের হিসাবে, ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে (ডিএসএস) মৃত্যু হয়েছে মাইশার।
মাইশার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়, উত্তরাঞ্চলে ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক ভয়ংকর চিত্রেরও একটি প্রতিচ্ছবি। রামেক হাসপাতালে গত কয়েক সপ্তাহে ডেঙ্গু রোগীদের একটি অংশ সাধারণ জ্বর, শরীর ব্যথা বা প্লাটিলেট কমে যাওয়ার পর্যায় পেরিয়ে দ্রুত ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম ও হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা মায়োকার্ডাইটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকেরই হাসপাতালে ভর্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে।
হাসপাতালের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে, নতুন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত ২৯ জন ভর্তি হয়েছেন। ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩২ জন। মারা গেছেন একজন। বর্তমানে হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১১১ জন।
২৮ দিনে ১১ মৃত্যু
রামেক হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের ৭ জুন থেকে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি শুরু হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৯৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৮৭২ জন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের। বর্তমানে আইসিইউতে রয়েছেন একজন।
মৃত ১৪ জনের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচজন, রাজশাহীর পাঁচজন, কুষ্টিয়ার দুজন, পাবনা ও নাটোরের একজন করে। তাদের মধ্যে শিশু তিনজন এবং প্রাপ্তবয়স্ক ১১ জন। পুরুষ নয়জন ও নারী পাঁচজন।
মাসভিত্তিক মৃত্যুর হিসাবে জানুয়ারিতে দুজন, জুনে একজন, আগস্টে দুজন এবং সেপ্টেম্বরেই মারা গেছেন নয়জন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ৩১ আগস্ট থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর—মাত্র ২৮ দিনে মারা গেছেন ১১ জন। তাদের ১০ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম এবং একজনের ক্ষেত্রে ডেঙ্গুজনিত হৃদ্যন্ত্রের জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘণ্টার ব্যবধানে সংকটাপন্ন
রামেক হাসপাতালে সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনাগুলোতে রোগীদের দ্রুত শারীরিক অবনতির চিত্রও উঠে এসেছে। ৩১ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের আব্দুল হান্নান হাসপাতালে ভর্তির প্রায় ১৪ ঘণ্টা পর মারা যান। ৯ সেপ্টেম্বর পাবনার বেড়ার ইমরুল কায়েস ভর্তি হওয়ার মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে মারা যান। পরদিন নাটোরের বনপাড়ার কলেজছাত্র জিৎ সরকার ভর্তির প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর মারা যান।
১৪ সেপ্টেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটের হৃদয় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরদিন ভোরে মারা যান। ১৫ সেপ্টেম্বর মারা যান চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার বালুবাগান এলাকার আসমা খাতুন। ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ভর্তি হওয়া তানোরের আনোয়ার মণ্ডল মারা যান মাত্র আট ঘণ্টা পর। ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে ভর্তি হওয়া বাগমারার স্কুলশিক্ষার্থী সাথী রাণী পরদিন ভোরে মারা যান।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের আব্দুল করিম পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২১ সেপ্টেম্বর মারা যান। রাজশাহী নগরীর সুলতানাবাদ এলাকার নাসরিন ২০ সেপ্টেম্বর সকালে ভর্তি হওয়ার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মারা যান। এর পর সর্বশেষ মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হলো চার বছরের শিশু মাইশার নাম।
৪৫ বেডে ১১১ রোগী
ডেঙ্গু রোগীদের জন্য রামেক হাসপাতালের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে ৪৫টি শয্যা। সেপ্টেম্বরজুড়ে রোগীর চাপ থাকায় প্রায়ই এসব শয্যা পূর্ণ থাকছে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীলরা।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যে ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে আরও ৬০টি বেড বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ডেঙ্গু ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনরত এক সিনিয়র নার্স নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সেপ্টেম্বরে প্রায় সবসময়ই বেড পূর্ণ থাকছে। অনেক সময় কোনো শয্যাই খালি পাওয়া যায় না। এর সঙ্গে নার্স সংকটও রয়েছে। তবে একই সময়ে রোগীর সংখ্যা খুব বেশি বেড়ে না যাওয়ায় সবসময় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
ঘরে ঘরে আক্রান্ত
রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে ডেঙ্গুর বিস্তারের আরেকটি চিত্র পাওয়া যায়।
রাজশাহী পুঠিয়ার চিত্তরঞ্জন কালবেলাকে জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে হাসপাতালে ভর্তি আছি। আমার বাড়ি পুঠিয়ায় হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর এলাকায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এখন আগের চেয়ে ভালো আছি। এখানকার চিকিৎসক ও নার্সরা আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দিচ্ছেন। তবে প্রয়োজনীয় অনেক ওষুধ হাসপাতাল থেকে না পাওয়ায় বাইরে থেকে কিনে আনতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়তি খরচের চাপও সামলাতে হচ্ছে।
রাজশাহী খড়খড়ি এলাকার সুমন কালবেলাকে জানান, ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চলছে। সেবার মান নিয়ে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। তবে চাহিদা অনুযায়ী সব ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না। বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে গিয়ে প্রতিদিনই অতিরিক্ত টাকা খরচ হচ্ছে। অসুস্থ অবস্থায় এই বাড়তি ব্যয় পরিবারের জন্য বেশ চাপের।
নগরীর উপশহর আমবাগান এলাকার সেলিনা খাতুনের পরিবারের চারজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন সেলিনা নিজে, তার স্বামী এবং ১০ ও ১৬ বছর বয়সী দুই ছেলে। স্বামীকে দুর্গাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় মশা কামড়ানোর কথা মনে থাকলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা কখন মশার কামড় খেয়েছেন, তা টের পাননি। পরে পরীক্ষায় তাদের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়।
পবা উপজেলার মুমিন শেখ জানান, রান্নাঘরে মশার কামড়ের পর থেকেই তার শরীরে ডেঙ্গুর বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।
দেরিতে হাসপাতালে, বাড়ছে ঝুঁকি
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুতে সবচেয়ে ভয়ংকর জটিলতাগুলোর একটি ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম। এ অবস্থায় রক্তনালির দেয়াল থেকে অতিরিক্ত প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়ায় শরীরে কার্যকর রক্তের পরিমাণ দ্রুত কমে যায়। রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে নেমে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে অল্প সময়েই রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে পারে।
এবার ডেঙ্গুর সঙ্গে মায়োকার্ডাইটিসের মতো হৃদ্যন্ত্রের জটিলতাও চিকিৎসকদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ডেঙ্গু সংক্রমণ বা সংক্রমণজনিত প্রদাহের কারণে হৃদ্যন্ত্রের পেশিতে প্রদাহ তৈরি হলে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এবং রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামিম আহমেদ কালবেলাকে বলেন, অনেক রোগী জ্বরকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর মনে করে বাড়িতে চিকিৎসা নেন কিংবা স্থানীয়ভাবে ওষুধ সেবন করে সময় পার করেন। শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে গেলে হাসপাতালে আসেন। তখন অনেকের শরীরে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম বা মায়োকার্ডাইটিসের মতো জটিলতা তৈরি হয়ে যায়। ওই পর্যায়ে চিকিৎসা দিয়েও রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, জ্বর দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী এনএস-১ পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে প্রচণ্ড দুর্বলতা, পেটে ব্যথা, বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
মশার প্রজননস্থল ঘিরে উদ্বেগ
ডেঙ্গুর রোগী বাড়লেও এর অন্যতম বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনসম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। বৃষ্টির পর বাড়ি, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রীতে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিসের লার্ভা জন্মানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
রাজশাহী জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা কালবেলাকে বলেন, বছরের পর বছর নগরীতে মশার লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সাধারণ গৃহস্থালি সামগ্রীতেও এডিসের লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে। শুধু সিটি করপোরেশন বা কোনো সরকারি সংস্থার একক উদ্যোগে এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বৃষ্টির পর বাড়ি ও আশপাশে পানি জমে আছে কি না, নাগরিকদের নিয়মিত তা দেখতে হবে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন ডলার কালবেলাকে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
প্রতিরোধেই গুরুত্ব
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, জমে থাকা পানি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করে। তাই ডেঙ্গু হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি জমে থাকা পানি অপসারণ এবং সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অংশ হিসেবে প্রতি শনিবার জেলার নয়টি উপজেলায় ৭৮টি স্পটে একযোগে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
জ্বরকে আর সাধারণ জ্বর ভাবার সুযোগ নেই
রামেক হাসপাতালের সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনাগুলো বলছে, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শুধু আক্রান্তের সংখ্যা নয়, রোগীর হাসপাতালে পৌঁছানোর সময়টিও এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। জ্বরের শুরুতে চিকিৎসা না নিয়ে অপেক্ষা করা, স্থানীয়ভাবে ওষুধ খাওয়া কিংবা রোগের তীব্রতা বুঝতে দেরি করার পর যখন হাসপাতালে আসছেন অনেক রোগী, তখন তাদের একটি অংশ ইতোমধ্যে জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছেন।
আর সেই দেরির পরিণতি কখনো কখনো মাইশার মতো একটি শিশুর নিথর দেহ
চার বছরের মাইশা ২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে হাসপাতালে এসেছিল। ২৮ সেপ্টেম্বর রাত পেরোনোর আগেই ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে থেমে গেল তার ছোট্ট জীবনের স্পন্দন। রামেকের ১১১ ডেঙ্গু রোগীর ভিড়ে তার মৃত্যু যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—ডেঙ্গুকে মৌসুমি সাধারণ জ্বর ভেবে ঘরে বসে থাকার সময় শেষ। জ্বর হলেই সতর্কতা, দ্রুত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শই এখন সবচেয়ে জরুরি।



