
উন্নয়নকাজে বদলের অপেক্ষা, কমবে জনদুর্ভোগ; কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা
রাকিবুল ইসলাম, মোহনপুর (রাজশাহী) প্রতিনিধি: দুই উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে এগিয়ে চলছে রাজশাহীর মোহনপুর ও তানোর উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের উন্নয়নকাজ। মোহনপুর উপজেলার সইপাড়া থেকে তানোর উপজেলার গোল্লাপাড়া সীমানা পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার সড়কটি প্রশস্ত ও শক্তিশালীকরণের কাজ চলমান রয়েছে। সড়কটির কাজ শেষ হলে দুই উপজেলার মানুষের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বিভিন্ন অংশে খানাখন্দ, ভাঙন, সরু সড়ক ও দুর্বল অংশ থাকায় যানবাহন চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে মানুষকে। বিশেষ করে বড় যানবাহন চলাচল, পণ্য পরিবহন এবং রাতে মোটরসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি ছিল বেশি। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ত। সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত ও পাশের অংশ ভেঙে যাওয়ায় প্রায়ই যানজট ও দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হতো।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অসুস্থ রোগী, নবজাতক ও বয়স্ক মানুষকে নিয়ে এই সড়ক দিয়ে চলাচল ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত উপজেলা সদর কিংবা রাজশাহী শহরে যেতে সময় ও অর্থ দুটিই বেশি লাগত।
মোহনপুর ও তানোর উপজেলার মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সড়কটির গুরুত্ব অনেক। তানোর থেকে মোহনপুর হয়ে রাজশাহী শহরের দিকে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি দুই উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষিপণ্য, কাঁচামাল ও অন্যান্য ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহনে সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, সড়কটি ভালো হলে তানোর ও মোহনপুরের মধ্যে পণ্য পরিবহন আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে মন্ডুমালা ও চৌবাড়িয়া হাটসহ স্থানীয় হাটবাজারে কৃষিপণ্য ও গবাদিপশু পরিবহনেও সুবিধা বাড়বে।
এ ছাড়া তানোর থেকে মোহনপুর হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় পণ্য পরিবহনের সুযোগ আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে পরিবহন খরচ ও সময় কমার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়তে পারে।
এই সড়কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এলাকার কৃষকদের প্রত্যাশাও অনেক। ধান, সবজি, পাটসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনের পর তা দ্রুত বাজারে নেওয়া কৃষকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে এতদিন পণ্য পরিবহনে বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হয়েছে বলে জানান কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল আলীম মন্ডল (৪৬) বলেন, “রাস্তা খারাপ থাকায় কৃষিপণ্য নিয়ে বাজারে যেতে অনেক সময় লাগে। গাড়ি ভাড়া বেশি পড়ে এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। রাস্তার কাজ ভালোভাবে শেষ হলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে নেওয়া যাবে। এতে পরিবহন খরচ কমবে এবং আমরা পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পাব।”
সড়কটি সরু, ভাঙাচোরা ও ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় যানবাহন চালকদেরও নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বিশেষ করে দুটি বড় যানবাহন পাশাপাশি অতিক্রম করার সময় ঝুঁকি তৈরি হতো। কোথাও কোথাও রাস্তার পাশ ভেঙে যাওয়ায় চালকদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে হতো।

স্থানীয় পরিবহন চালক সোহাগ রানা(৩৩) বলেন, “আগে রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় গর্ত ছিল। রাস্তা সরু হওয়ায় দুটি গাড়ি একসঙ্গে গেলে সমস্যা হতো। রাতে গাড়ি চালানো আরও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। রাস্তার কাজ শেষ হলে গাড়ি চালানো সহজ হবে, দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমবে। সময় ও জ্বালানি—দুটিই সাশ্রয় হবে।”
সড়কটির আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেন দুই উপজেলার শিক্ষার্থী। বর্ষা ও খারাপ আবহাওয়ার সময় সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে তাদের বিদ্যালয় ও কলেজে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।
স্থানীয় শিক্ষার্থী মুমতাহিনা মম(২২)বলেন, “রাস্তা খারাপ থাকলে স্কুল-কলেজে যেতে অনেক সময় লাগে। বৃষ্টির সময় কাদা ও গর্তের কারণে যাতায়াত আরও কঠিন হয়ে যায়। রাস্তার কাজ ভালোভাবে শেষ হলে আমাদের নিয়মিত যাতায়াত অনেক সহজ হবে।”

সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, RDIRWSP প্রকল্পের আওতায় ‘Widening and Strengthening Works of Shaipara R&H Gollapara (up to Tulshi Khetro)’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে সড়কটির উন্নয়নকাজ চলছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সৈকত এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর মোছা. শাহেদা বেগম। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ১৫ জুন ২০২৫।
সড়কটির নির্ধারিত প্রশস্ততা প্রায় ১৮ ফুট। প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্ত ও শক্তিশালীকরণের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ড্রেন, কালভার্ট ও ব্রিজের কাজ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে এখনো মূল কার্পেটিং বা পিচ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়নি। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা জানান, বর্ষা ও অতিবৃষ্টির কারণে কয়েক মাস কাজের গতি কিছুটা কম ছিল। সড়কের বিভিন্ন অংশের পাশে পুকুর, পুকুরপাড় ও জলাশয় থাকায় বৃষ্টির পানি ও স্রোতে রাস্তার খোয়া-বালিসহ নির্মাণসামগ্রী নেমে যাওয়ার কারণে কিছু জায়গায় পুনরায় কাজ করতে হয়েছে। এ কারণেও কাজের গতি কিছুটা কমেছে।
সড়কের উন্নয়নকাজে গুণগত মান বজায় রাখতে রাজশাহী এলজিইডি ও মোহনপুর এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিত কাজ পরিদর্শন ও নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা করছেন বলে জানা গেছে।
মোহনপুর উপজেলা প্রকৌশলী কর্মকর্তা রকিব হাসান বলেন, “কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্মাণকাজের বিভিন্ন ধাপে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরিদর্শন করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্পের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
মোহনপুর এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী কর্মকর্তা রিপন আলী সরকার বলেন,
“সড়কটির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কাজের গুণগত মান ঠিক রাখতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। প্রকল্পের নির্ধারিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বর্ষার কারণে কিছু সময় কাজের গতি কম থাকলেও বর্তমানে কাজ চলমান রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। বিভ্রান্ত তথ্য বা গুজব থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। কোন সমস্যা বা অনিয়ম হলে আমাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করলে সমাধান করার চেষ্টা করবো।
মোহনপুর ও তানোর উপজেলার দুই স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা এই সড়কের দুর্ভোগের সঙ্গে বসবাস করছেন। উন্নয়নকাজ শুরু হওয়ায় তাদের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছে। তবে শুধু রাস্তা নির্মাণ করলেই হবে না, টেকসই ও মানসম্মতভাবে কাজ শেষ করার পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
মোহনপুরের স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম( ৩৮) বলেন, এই রাস্তা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগে রাস্তার কারণে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। উন্নয়নকাজ শেষ হলে মোহনপুর ও তানোরের মানুষের যোগাযোগ অনেক সহজ হবে। আমরা চাই কাজটি যেন টেকসই ও ভালো মানের হয়।”
তানোরের স্থানীয় বাসিন্দা মাহামুদা আক্তার (২৯)বলেন
“তানোর থেকে রাজশাহী শহরে যেতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে। মোহনপুর হয়ে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে আমাদের অনেক সুবিধা হবে। রোগী নিয়ে যাতায়াত, শিক্ষার্থীদের চলাচল এবং ব্যবসায়িক কাজে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশা করছি। বদলে যেতে পারে দুই উপজেলার অর্থনীতির ভাবমূর্তি জিডিপিতে ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি সড়ক শুধু মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সড়কটির উন্নয়ন শেষ হলে কৃষকরা দ্রুত তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে পারবেন। ব্যবসায়ীরা কম সময়ে পণ্য পরিবহন করতে পারবেন। পরিবহন খরচ কমলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে মোহনপুর ও তানোরের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ আরও সহজ হলে দুই উপজেলার মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার পাশাপাশি সড়কের নির্মাণমান নিশ্চিত করা হবে। দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে প্রায় ৭ কিলোমিটার এই সড়কটি শুধু যোগাযোগব্যবস্থাই নয়, বদলে দেবে দুই উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি—এমনটাই আশা তাদের।


