
বিগত শাসনামলে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব। তাঁর অভিযোগ, অতীতের অপকর্ম আড়াল করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অসাধু চক্র ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা দিচ্ছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে ঢাকার কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একটি স্থান পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর দাবি, ওই স্থানে র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক আনোয়ার লতিফের সংশ্লিষ্টতায় গুমের ঘটনা ঘটেছিল। এ সময় বাংলাদেশ গুম পরিবার কল্যাণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বেল্লাল হোসেনসহ গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, গুমের শিকার পরিবারগুলোর ওপর প্রশাসনিক হয়রানি বা অন্যায্য পদক্ষেপ নেওয়া হলে তিনি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবেন। নিজের ক্ষতি হলেও শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের পক্ষে থাকার অঙ্গীকার করেন তিনি।
হাবিবের অভিযোগ, বিগত সরকার ও তাদের সহযোগীরা গুমের প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে নানা ধরনের বক্তব্য ছড়িয়েছিল। গুম হওয়া ব্যক্তিরা রাগ বা অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন কিংবা গুমের ঘটনাগুলো সাজানো—এমন দাবি করে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ গুম পরিবার কল্যাণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বেল্লাল হোসেনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বেল্লালকে নিয়ে একসময় প্রচার করা হয়েছিল, ব্যবসায়িক সংকটের কারণে তিনি নিজেই আত্মগোপনে গেছেন। অথচ বেল্লালের ভাইয়ের সাক্ষ্য অনুযায়ী, তাঁকে র্যাবের সদস্যরা জোর করে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অপপ্রচার বন্ধ না হলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান সরকারের কিছু উদ্যোগের প্রশংসা করলেও প্রশাসনের ভেতরে এখনো অসাধু কর্মকর্তারা সক্রিয় রয়েছেন বলে অভিযোগ করেন হাবিব। তাঁর ভাষ্য, এসব কর্মকর্তা অর্থ ও অন্যান্য সুবিধার বিনিময়ে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ‘গায়েবি মামলা’ দিয়ে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করছেন।
নিজের এলাকা পাবনা ও ঈশ্বরদীর পরিস্থিতি তুলে ধরে হাবিব বলেন, ঈশ্বরদীতে মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। অপরাধের বিষয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ দিতে গেলে তা গ্রহণ করা হয় না বলে অভিযোগ করেন তিনি। বরং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে করা পাল্টা মামলা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে তাঁর দাবি। স্থানীয় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার পাননি বলে জানান তিনি।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের একটি ঘটনার উল্লেখ করে হাবিব বলেন, ২০১৫ সালের ১২ জানুয়ারি চ্যানেল ২৪-এর একটি টকশো শেষে বের হওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তাঁর বিরুদ্ধে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে একাধিক মামলা করা হয় বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই মামলায় তৎকালীন বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাঁকেসহ ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকে চার বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
হাবিব বলেন, অতীতে রাজনৈতিক নেতাদের দমন করতে যেভাবে মামলা ব্যবহারের অভিযোগ ছিল, প্রশাসনের কিছু ব্যক্তি এখনো একই ধরনের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে হাবিব বলেন, অনেক পরিবার ১০, ১২ কিংবা ১৫ বছর ধরে প্রিয়জনের অপেক্ষায় রয়েছে। গুমের সময় যেসব শিশু ছোট ছিল, তারা বড় হয়ে গেলেও তাদের বাবা জীবিত আছেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি।
তিনি বলেন, স্বজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হলে পরিবার অন্তত শোক পালনের সুযোগ পায়। কিন্তু গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্ত্রী ও সন্তানদের অনেকেই জানেন না তাঁদের প্রিয়জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে। সন্তানদের স্কুলে সহপাঠীরা বাবার বিষয়ে জানতে চাইলে তারা উত্তর দিতে পারে না—এমন পরিস্থিতিও তুলে ধরেন তিনি।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হাবিব বলেন, সরেজমিনে তদন্ত ও বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে হবে। এতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আইনি সুরক্ষা পেতে পারে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ গুম পরিবার কল্যাণ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বেল্লাল হোসেন বলেন, ২০১৬ সালে অনলাইনে বাসের টিকিট কেটে যাত্রার সময় এসবি কাউন্টারের সামনে থেকে ১২ থেকে ১৪ জন ব্যক্তি তাঁকে একটি মিনিবাসে জোর করে তুলে নিয়ে যায় বলে তাঁর অভিযোগ। সে সময় প্রত্যক্ষদর্শী ও রাজসাক্ষী উপস্থিত ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
বেল্লাল জানান, ঘটনার পর তাঁর পরিবার মিরপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। পরে তদন্ত শেষে পুলিশ সেটিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করে। এ ঘটনা নিয়ে সে সময় জাতীয় দৈনিকগুলোতে ধারাবাহিক প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
পুলিশ প্রশাসন, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশের মহাপরিদর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বেল্লাল বলেন, অনলাইনে কাটা বাসের টিকিট, জিডির কপি, তদন্ত প্রতিবেদন ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদন রয়েছে। এসব নথি থাকা সত্ত্বেও গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার ন্যায়বিচার পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, বিগত সরকারের আমলে গুম-সংক্রান্ত কল রেকর্ড (সিডিআর) প্রতিবেদনসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করে দেওয়া হয়েছিল।
বেল্লালের আরও অভিযোগ, জুলাই গণহত্যা ও গুমের মামলায় অভিযুক্ত কয়েক হাজার পুলিশ কর্মকর্তা নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অর্থের বিনিময় ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে এসব মামলা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
নড়াইল, ঝালকাঠি, খাগড়াছড়ি, সিলেট ও হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় গুমের শিকার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা ও অন্যান্য হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন বেল্লাল। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের হয়রানি অব্যাহত থাকলে গুম ও গোপন আটককেন্দ্রকেন্দ্রিক নির্যাতনের সংস্কৃতি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হবে।
তবে অনুষ্ঠানে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তা, পুলিশ প্রশাসন ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।


