
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয় যেন শুধু একটি ম্যাচের ফল নয়, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে বড় এক আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দিয়েছে। ডারউইনে ৯ উইকেটের দাপুটে জয়ের পর দেশটির সংবাদমাধ্যম, সাবেক অধিনায়ক ও ক্রিকেট বিশ্লেষকদের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়ার দল নির্বাচন, পারফরম্যান্স ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন। কেউ বাংলাদেশের জয়কে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন বলছেন, কেউ আবার ঘরের মাঠে এটিকে সবচেয়ে লজ্জাজনক পরাজয়গুলোর একটি হিসেবে দেখছেন। বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাটিং, বোলিং, শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা ও দলীয় পরিকল্পনার প্রশংসায় সরব অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট মহল।
অস্ট্রেলিয়ার সেভেন নিউজ বাংলাদেশের জয়কে ঐতিহাসিক হিসেবে তুলে ধরেছে। অস্ট্রেলীয় ধারাভাষ্যকার টিম লেনের মন্তব্য উদ্ধৃত করে তারা ডারউইনের জয়কে ‘বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অসাধারণ মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এবিসি-র ম্যাচ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ রানে গুটিয়ে গেলেও বাংলাদেশ করে ৪২৬ রান। ২২৮ রানের লিড নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে থামিয়ে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য পায় বাংলাদেশ। চতুর্থ দিনেই এক উইকেট হারিয়ে সেই লক্ষ্য পেরিয়ে যায় সফরকারীরা।
আরও কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে ডেইলি টেলিগ্রাফ থেকে। বাংলাদেশের জয়কে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন হিসেবে উল্লেখ করে তাদের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ম্যাচের ১১টি পর্বেই বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে কার্যত পেছনে ফেলেছে।
ফক্স স্পোর্টসও এটিকে অস্ট্রেলিয়ার ঘরের মাঠে বড় অঘটন হিসেবে দেখেছে। একই সঙ্গে দল পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা। দ্য অস্ট্রেলিয়ান-এর প্রতিবেদনে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক প্যাট কামিন্স স্বীকার করেছেন, বাংলাদেশ তাদের ছাড়িয়ে গেছে।
সাবেক অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক রিকি পন্টিং পরাজয়টিকে ‘অত্যন্ত লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করে দলে পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, এবার নতুন খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়ার সময় এসেছে। সাবেক অধিনায়ক ম্যাথিউ হেইডন ও তারকা ক্রিকেটার মার্ক ওয়াহও অস্ট্রেলিয়া দলে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
ডারউইনে বাংলাদেশের ইতিহাস
মারারা স্টেডিয়ামে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ রানে অলআউট হওয়ার পর বাংলাদেশ ৪২৬ রান করে। এতে ২২৮ রানের লিড পায় সফরকারীরা। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া ২৮৪ রানে গুটিয়ে গেলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় ৫৭ রান। চতুর্থ দিনেই মাত্র এক উইকেট হারিয়ে সেই লক্ষ্য পেরিয়ে যায় নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট জয়। এর আগে ২০১৭ সালে ঢাকায় অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ।
এই জয়ের অন্যতম নায়ক হাসান মাহমুদ। পুরো ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরার পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের ৫ উইকেট অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসিয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর তানজিদ হাসানের ১০১ রানের শতক অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটারের প্রথম টেস্ট শতক।
অথচ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টের আগে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়েছিল বাংলাদেশ। কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই দলই অস্ট্রেলিয়ার মূল দলকে তাদের ঘরের মাঠে ৯ উইকেটে হারিয়েছে।
বিদেশের মাটিতে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ
২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে ঢাকায় টেস্ট অভিষেক বাংলাদেশের। দীর্ঘ ২৬ বছরের পথচলায় উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে টাইগাররা।
২০০৯ সালে কিংসটাউনে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৯৫ রানে হারিয়ে বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় পায় বাংলাদেশ। এরপর ২০১৬ সালে ঢাকায় ইংল্যান্ডকে ১০৮ রানে এবং ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়াকে ২০ রানে হারায় তারা। ২০২২ সালে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডকে ৮ উইকেটে হারিয়ে তাদের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় আসে। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে দুই ম্যাচের সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতে নেয় বাংলাদেশ।
তাই ডারউনের জয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে ওঠার ধারাবাহিকতারই নতুন অধ্যায়।
এই জয় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ২০২৫-২৭ চক্রেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করেছে। তবে সামনে আরও বড় পরীক্ষা। দুই ম্যাচের সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে ২২ আগস্ট ম্যাকেতে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম জয় পাওয়ার পর এবার সিরিজ জয়ের হাতছানি বাংলাদেশের সামনে।
একসময় বিদেশের মাটিতে টেস্ট খেলতে নামলে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন থাকত—কতটা সময় টিকে থাকা যাবে? ডারউইনের পর সেই প্রশ্ন বদলে গেছে। এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশ কত দূর যেতে পারে?
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ শুধু টিকে থাকেনি; চার দিনের লড়াইয়ে ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং ও দলীয় পরিকল্পনায় আধিপত্য দেখিয়ে তুলে নিয়েছে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়।
ডারউনের আকাশে তাই শুধু একটি জয় লেখা হয়নি—লেখা হয়েছে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের নতুন আত্মবিশ্বাসের গল্প। যে বাংলাদেশ একসময় টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের জায়গা খুঁজছিল, সেই বাংলাদেশই এখন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস লিখছে।


