
ডেঙ্গুর নতুন রূপ ‘শক সিন্ড্রোম ও মায়োকার্ডাইটিসে’ মৃত্যুঝুঁকি
প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি
আক্রান্তদের বড় অংশই প্রান্তিক জনপদের, দ্রুত অবনতি হচ্ছে রোগীদের শারীরিক অবস্থার
রাজশাহী উত্তরাঞ্চলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিপজ্জনক রূপ নিতে শুরু করেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ক্রমাগত বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। তবে সাধারণ লক্ষণের বাইরে গিয়ে এবার রোগীদের মধ্যে ‘ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম’ ও জটিল হৃদরোগ ‘মায়োকার্ডাইটিস’-এর মতো মারাত্মক উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। ফলে হাসপাতালে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন রোগীরা।

গত পাঁচ দিনে (১৯ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর) রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুজনিত কারণে হৃদযন্ত্রের স্পন্দন বন্ধ হয়ে। এ সময় নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১৩০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১০৭ জন। সবশেষ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ১০৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ ও রোগীর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মৃত্যুর ঘটনাগুলোর বড় কারণ হলো হাসপাতালে দেরিতে পৌঁছানো এবং ডেঙ্গুর মারাত্মক জটিলতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া।
ভর্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মৃত্যু রামেক হাসপাতালের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মারা যাওয়া তিনজনই প্রান্তিক জনপদের বাসিন্দা। রাজশাহীর তানোর উপজেলার মো. আনোয়ার মণ্ডল (৫২) ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ১০টা ২১ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টার পরও মাত্র আট ঘণ্টার মাথায় ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা ২০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়।
একই জটিলতায় প্রাণ হারিয়েছে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ১৬ বছর বয়সী কিশোরী সাথী রাণী। ১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে ভর্তির পর ২০ সেপ্টেম্বর ভোর ৫টা ২০ মিনিটে মারা যায় সে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাথী রানীর ক্ষেত্রেও রোগটি দ্রুত ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে রূপ নেয়।
সবশেষ ২২ সেপ্টেম্বর সকালে মারা যান চাঁপাইনবাবগঞ্জের পোলাডাঙ্গার কৃষক আব্দুল করিম (৪৫)। গত ১৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এই রোগীর চিকিৎসায় ভিন্ন জটিলতা ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, তার মৃত্যুর কারণ ছিল ‘সন্দেহভাজন ডেঙ্গু মায়োকার্ডাইটিস’। এর ফলে হৃদযন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দন দেখা দেয় এবং আকস্মিক কার্ডিয়াক ডেথে তার প্রাণহানি ঘটে।
পাঁচ দিনের চিত্র: চাপ কমছে না ওয়ার্ডে গত পাঁচ দিনের ভর্তি ও ছাড়পত্রের পরিসংখ্যান বলছে, রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে:
১৯ সেপ্টেম্বর: নতুন ভর্তি ২০ জন, ছাড়পত্র ১২ জন, মৃত্যু ১ জন।
২০ সেপ্টেম্বর: নতুন ভর্তি ৩১ জন, ছাড়পত্র ১৮ জন, মৃত্যু ১ জন।
২১ সেপ্টেম্বর: নতুন ভর্তি ২৬ জন, ছাড়পত্র ২৭ জন (মৃত্যু নেই, চিকিৎসাধীন ছিলেন ১০৪ জন)।
২২ সেপ্টেম্বর: নতুন ভর্তি ২৯ জন, ছাড়পত্র ২৫ জন, মৃত্যু ১ জন (চিকিৎসাধীন ছিলেন ১০৭ জন)।
২৩ সেপ্টেম্বর (বুধবার): নতুন ভর্তি ২৪ জন, ছাড়পত্র ২৫ জন। বর্তমানে ভর্তি আছেন ১০৬ জন।
দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে ২৫ জনের বেশি নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে আসছেন।
দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে রামেক
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামিম আহমেদ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ২৪ জন নতুন রোগী ভর্তির বিপরীতে ২৫ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন। আব্দুল করিমের মৃত্যুর পর বর্তমানে হাসপাতালে মোট ১০৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন আছেন।
চিকিৎসকদের মতে, জ্বর হলে অবহেলা করা বা স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সময় নষ্ট করার ফলেই রোগীরা একেবারে শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আসছেন। ফলে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম কিংবা মায়োকার্ডাইটিসের মতো জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে। জ্বর দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এনএস-১ (NS1) পরীক্ষাসহ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


