
জিএসের দাবি, আগে যোগাযোগ ও আবেদন তাঁর; শিবির বলছে, ২০২৪ থেকেই উদ্যোগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স উপহার পাওয়া নিয়ে এবার সামনে এসেছে কৃতিত্বের বিরোধ। অ্যাম্বুলেন্সটির জন্য সংশ্লিষ্ট দাতার সঙ্গে ছাত্রশিবিরের আগে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন এবং রাকসুর পক্ষ থেকে আবেদনও করেছিলেন বলে দাবি করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাহউদ্দিন আম্মার। তবে বুধবার অ্যাম্বুলেন্স হস্তান্তর অনুষ্ঠানে সেটিকে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দেওয়া উপহার হিসেবে উল্লেখ করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। অন্যদিকে রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবা উন্নয়নের উদ্যোগের অংশ হিসেবে তারা ২০২৪ সালের শুরু থেকেই অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে কাজ করছিল এবং সংগঠনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়েছিল।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন-১ চত্বরে অ্যাম্বুলেন্সটি হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, “অ্যাম্বুলেন্সটি ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে।” রাকসুর ভিপি ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাকুর রহমান জাহিদও অ্যাম্বুলেন্সটি ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
এর কয়েক ঘণ্টা পর নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার দাবি করেন, অ্যাম্বুলেন্সটির উদ্যোগ তাঁর আগে নেওয়া। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৬ আগস্ট জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে (জকসু) অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার পর দাতা চিকিৎসক এস এম খালিদুজ্জামানের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। তখন তিনি রাবির শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি অ্যাম্বুলেন্স ও কিছু মেডিকেল সরঞ্জাম দেওয়ার অনুরোধ করেন।
আম্মারের দাবি, চিকিৎসক খালিদুজ্জামান তাঁর পরিচিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ হয়। ১৭ আগস্ট চিকিৎসক তাঁকে ফোন করে জানান, তাঁর স্ত্রী ও লতিফা রশিদ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের অনুমোদনের মাধ্যমে রাবির জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার বিষয়টি অনুমোদিত হয়েছে। পরে রাকসুর জিএস হিসেবে তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করেন এবং নির্ধারিত সময়ে আবেদনও করেন বলে দাবি তাঁর।
আম্মার আরও দাবি করেন, ২১ আগস্ট ঢাকায় গিয়ে তিনি চিকিৎসক খালিদুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই দিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাবির শিক্ষার্থীরা একটি অ্যাম্বুলেন্স পেতে যাচ্ছেন বলে পোস্ট করেন। রাকসুর সদস্যদেরও বিষয়টি জানান এবং ভিপিকে বিষয়টি অবহিত করেন বলে তাঁর ভাষ্য।
তাঁর দাবি, পরবর্তী সময়ে ৭ সেপ্টেম্বর ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে তাদের সভাপতি অ্যাম্বুলেন্সটি ‘ম্যানেজ’ করেছেন বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে তিনি ভিপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাড়া পাননি।
অ্যাম্বুলেন্সটি ছাত্রশিবিরের নামে দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আম্মার বলেন, শিক্ষার্থীরা অ্যাম্বুলেন্স পেয়েছেন—এটাই তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি রাকসুর পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে উল্লেখ করা হলে তাঁর আপত্তি থাকত না। অ্যাম্বুলেন্সের উদ্যোগে কে আগে যোগাযোগ করেছেন, তার প্রমাণ দেখানোর জন্যও তিনি ছাত্রশিবিরের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
‘২০২৪ থেকেই উদ্যোগ’
তবে রাকসু জিএসের দাবির সঙ্গে একমত নয় ছাত্রশিবির। সংগঠনটির রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, ২০২৪ সালের শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে তারা প্রস্তাব দিয়ে আসছেন।
তিনি বলেন, “সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের ইশতেহারেও মেডিকেল-সংক্রান্ত বিষয়টি ছিল। সেখান থেকেই আমাদের পক্ষ থেকে সভাপতির মাধ্যমে চিকিৎসক এসএম খালিদুজ্জামানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা হয়েছিল।”
মেহেদী হাসানের ভাষ্য, চিকিৎসক খালিদুজ্জামান নিজেই পরে তাদের সভাপতিকে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার বিষয়ে জানান।
তবে কে আগে যোগাযোগ করেছিলেন—এ বিষয়ে নিশ্চিত নন বলেও স্বীকার করেন তিনি। “কে আগে যোগাযোগ করেছে বা কে আগে অ্যাপ্রোচ করেছে, সেটা আমাদের জানা নেই। আমাদের ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি নিজেই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। আম্মার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন কি না, সেটা আমাদের জানা সম্ভব নয়,” বলেন তিনি।
‘কে দিয়েছে, সেটি মুখ্য নয়’
এ বিষয়ে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “অ্যাম্বুলেন্সটি কে দিয়েছে, সেটি মুখ্য বিষয় নয়। শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবায় এটি কাজে লাগবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবিরকে সহযোগিতা করবে—এটি স্বাভাবিক বিষয়। পাশাপাশি সালাহউদ্দিন আম্মার আরও একটি অ্যাম্বুলেন্স দিতে পারলে সেটিও শিক্ষার্থীদের জন্য উপকারী হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বুধবারের হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলীম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুনুর রশীদ, ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এএইচএম খুরশীদ আলম, রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল ও সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
অ্যাম্বুলেন্সটির দাতা হিসেবে চিকিৎসক এস এম খালিদুজ্জামানের নাম দুই পক্ষের বক্তব্যেই এসেছে। তবে কে প্রথম যোগাযোগ করেছিলেন এবং কার উদ্যোগে অ্যাম্বুলেন্সটি চূড়ান্তভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ হয়—এ নিয়ে দুই পক্ষের দাবির মধ্যে এখনো সমাধান হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য পাওয়া একটি সেবামূলক উপহারের কৃতিত্বের প্রশ্নটিই রাবির ক্যাম্পাসে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।


