
চৌধুরী মাহবুব, চট্টগ্রাম: বয়স কম দেখিয়ে নিয়োগ, ভুয়া অভিজ্ঞতা দেখিয়ে পদোন্নতি, তদবিরের জোরে ডিঙিয়ে যাওয়া জ্যেষ্ঠতা— এসবের মধ্য দিয়েই ধাপে ধাপে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) শীর্ষ পদে পৌঁছেছেন একজন কর্মকর্তা। যিনি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত পূরণ না করেও চাকরি পেয়েছেন।
শুধু তাই নয়, জমি ব্যবহারের ছাড়পত্র অনুমোদন থেকে ভবন নির্মাণের অনুমতি— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর বিরুদ্ধে উঠেছে ঘুষ আর ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ।
অভিযুক্ত সেই কর্মকর্তা হলেন সিডিএর ভারপ্রাপ্ত উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী। তবে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত পূরণ না করেও কীভাবে তিনি চাকরি পেলেন, আর কীভাবেই বা পার পেয়ে গেলেন একের পর এক অনিয়মের অভিযোগ থেকে— এ প্রশ্নে এখন তোলপাড় সিডিএ।

প্রথম চাকরিতেই বয়সে ‘গরমিল’
১৯৭৭ সালের ১০ জুলাই জন্ম নেওয়া আবু ঈসা আনছারী ২০০৫ সালের ২ এপ্রিল সিডিএর “প্রিপারেশন অব ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান ফর চিটাগাং মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান” প্রকল্পে ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে শিক্ষানবিশ নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে যোগ দেন। এর দুই বছর পর, ২০০৭ সালের ১০ জুলাই সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ পদে আবেদন করেন তিনি। এই পদের জন্য নগর পরিকল্পনায় স্নাতক ডিগ্রিসহ সর্বোচ্চ ৩০ বছর বয়সের শর্ত ছিল।
নথিপত্র অনুযায়ী, ৩০ জুলাই জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে আবু ঈসা তাঁর বয়স উল্লেখ করেন ৩০ বছর ২২ দিন— অর্থাৎ নির্ধারিত সীমার চেয়ে ২২ দিন বেশি। অভিজ্ঞতার ঘরে তিনি দাবি করেন, ২০০৫ সালের ২ এপ্রিল থেকে সিডিএর ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান প্রকল্পে টাউন প্ল্যানার হিসেবে কর্মরত আছেন। একই বছরের ২২ নভেম্বর তিনি চুক্তিভিত্তিক সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে যোগ দেন ‘অনন্যা আবাসিক প্রকল্পে’।
দ্বিতীয় চাকরিতে অভিজ্ঞতা জালিয়াতি
এক বছরের মাথায়, ২০০৮ সালের ২৭ জুলাই নগর পরিকল্পনাবিদ পদে আবেদন করেন আবু ঈসা। এই পদের জন্য স্নাতক ডিগ্রির পাশাপাশি সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে ন্যূনতম ছয় বছরের অভিজ্ঞতা এবং কমপক্ষে ৩৫ বছর বয়সের শর্ত রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই শর্ত পূরণ না করেই তিনি আবেদন করেন।
১০ আগস্ট জমা দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে তাঁর বয়স দেখানো হয় ৩১ বছর ১৫ দিন— নির্ধারিত বয়সসীমার চেয়ে প্রায় চার বছর কম। অভিজ্ঞতার অংশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ছয় বছর ১৫ দিন দেখানো হলেও অভিযোগ উঠেছে, সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাঁর প্রকৃত অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র তিন বছর তিন মাস। শর্ত পূরণ না করলেও তদবিরের মাধ্যমে ২০০৮ সালের ২০ নভেম্বর নগর পরিকল্পনাবিদ পদে নিয়োগ পান তিনি— এমন দাবি উঠেছে অভিযোগে।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, জীবনবৃত্তান্তে তিনি ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর থেকে ‘অনন্যা আবাসিক প্রকল্পে’ চুক্তিভিত্তিক অভিজ্ঞতা, ২০০৮ সালের ৭ এপ্রিল থেকে প্রকল্প ব্যবস্থাপকের অতিরিক্ত দায়িত্ব এবং প্রধান পরিকল্পনাবিদ বিদেশে থাকাকালে ২৯ জুন থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত নগর পরিকল্পনাবিদের দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করেছেন।
এর বাইরে ২০০৫ সালের ২ এপ্রিল থেকে ২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর পর্যন্ত সিডিএর ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান প্রকল্পে এবং ২০০২ সালের ১০ জুলাই থেকে ২০০৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মেট্রো মেকার্স ডেভেলপার্স লিমিটেডে সহকারী নগর পরিকল্পনাবিদ হিসেবে কাজ করার দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ উঠেছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত অনুযায়ী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা গণনার সুযোগ না থাকলেও তা যুক্ত করে যোগ্যতা পূরণ দেখানো হয়েছে।
অভিযোগের পর ‘ চাপে চুপ’ আরেক কর্মকর্তা
নিয়োগের অনিয়ম, চলতি দায়িত্ব বাতিল এবং পদমর্যাদা অনুযায়ী গ্রেডেশন তালিকা প্রণয়নের দাবিতে ২০০৯ সালে তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করেছিলেন চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের বর্তমান পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান।
আবেদনে বলা হয়, বয়স ও চাকরির অভিজ্ঞতায় জুনিয়র হয়েও আবু ঈসা আনছারী উচ্চতর পদে অবস্থান করছেন, যাতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা পদমর্যাদা ও বেতন স্কেলের দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নবসৃষ্ট পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে মাহফুজুর রহমান দাবি করেন, তিনি ওই অভিযোগ প্রত্যাহার করেছিলেন এবং ভুলবশত অভিযোগ করেছিলেন।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিডিএর কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, চাপে পড়েই তিনি অভিযোগ প্রত্যাহারের কথা বলছেন।
এলইউসি অনুমোদনেও অনিয়মের অভিযোগ
নিয়োগ-বিতর্কের বাইরে আবু ঈসা আনছারীর বিরুদ্ধে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র বা ল্যান্ড ইউজ ক্লিয়ারেন্স (এলইউসি) অনুমোদনেও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ গ্রহণ, ভূমি ব্যবহার সনদ ও নকশা অনুমোদনে অনিয়ম, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া, জলাধার ভরাটের অনুমোদনে প্রভাব খাটানো, প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপন করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত উপ-প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারীর বয়সে ২২ দিনের হেরফের রয়েছে। তবে তিনি যখন নিয়োগ পান, তখন বুয়েট পাস করা নগর পরিকল্পনাবিদ কম ছিল, এ কারণেই হয়তো এই হেরফের হয়েছে। এটি মূলত পদোন্নতি না পেয়ে অনেকে বিষয়টি তুলছেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। আইন ও বিধি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে আবু ঈসা আনছারীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


