
পদ্মার বুকে জেগে ওঠা মিডলচরে বাড়ছে পর্যটকের ভিড়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিওতে ‘রাজশাহীর মিনি সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে পদ্মার বুকে জেগে ওঠা মিডলচর। প্রতিদিনই বাড়ছে দর্শনার্থীর আনাগোনা। তবে পর্যটকের এই বাড়তি চাপ আনন্দের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি করেছে উদ্বেগ। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, কৃষিজমি ও গবাদিপশুর ক্ষতি এবং ড্রোন ক্যামেরার অবাধ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা এই চরে ছুটির দিনসহ বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভিড় করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিচিত দর্শনার্থীদের কেউ কেউ অনুমতি ছাড়াই বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ছেন। এতে নারী ও শিশুদের স্বাভাবিক চলাচলে অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। 
ড্রোন-ক্যামেরায় বাড়ছে অস্বস্তি
স্থানীয়দের উদ্বেগের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ড্রোন ক্যামেরার ব্যবহার। দর্শনার্থীদের কেউ কেউ আকাশে ড্রোন উড়িয়ে চর ও আশপাশের এলাকার ভিডিও ধারণ করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ড্রোন অনেক সময় বাড়িঘর ও ব্যক্তিগত পরিসরের ওপর দিয়ে উড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিন (৭৫) বলেন, আমরা চাই মানুষ ঘুরতে আসুক। আমাদের এলাকার সৌন্দর্য সবাই দেখুক। কিন্তু আমাদের পরিবার ও মা-বোনদের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টিও দেখতে হবে। ড্রোন দিয়ে বাড়িঘর ও মানুষের ছবি ধারণ করা হলে আমরা অস্বস্তিতে পড়ি।
মরিয়ম নেছা (৪৫) বলেন, আমরা যখন গোসল করি, তখন আমাদের মাথার ওপরে কোনো ছাদ থাকে না। ওই সময় ক্যামেরা বা ড্রোনের মাধ্যমে ছবি তুলে নেওয়া হলে আমরা খুব অস্বস্তি বোধ করি। প্রশাসনের সহযোগিতা চাই, যাতে এসব নিয়ন্ত্রণে থাকে।
তার অভিযোগ, পাশেই টিউবওয়েল থাকার পরও কোনো কোনো দর্শনার্থী পানি খাওয়ার অজুহাতে স্থানীয় বাড়িতে ঢুকে পড়ছেন। এতে ঘরের নিরাপত্তা নিয়েও পরিবারের সদস্যরা শঙ্কায় থাকেন।
ক্ষতির মুখে কৃষি ও গবাদিপশু
দর্শনার্থীর বাড়তি চাপ শুধু নিরাপত্তা বা গোপনীয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় কৃষি ও গবাদিপশু পালনের ওপরও।
স্থানীয় বাসিন্দা লালন আহমেদ বলেন, আমরা এখানে বছরে একবার কালাই ফসল বুনে থাকি। এখন বেশি মানুষের যাতায়াতের কারণে খুব বিড়ম্বনায় পড়েছি। এভাবে মানুষ চলাচল করলে এ বছর ফসল করতে পারব কি না, তা নিয়েই চিন্তায় আছি।
গবাদিপশু পালনকারী ইব্রাহিম হোসেন বলেন, আমাদের একমাত্র জীবিকার প্রধান মাধ্যম গরু ও ভেড়া পালন। অথচ লোকসমাগম বেশি হওয়ার কারণে চরের ঘাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দর্শনার্থীরা গরুর সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়ে গরুকে বিরক্ত করেন, তাড়িয়ে বেড়ান। এতে গরু-ভেড়া ঠিকমতো ঘাস খেতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, দর্শনার্থীদের ফেলে যাওয়া চিপসের প্যাকেট, বাদামের খোসা ও পলিথিনে চরটির পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে।
মিডলচরের সরদার লুৎফর রহমান বলেন, দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। পর্যটকরা যেন আনন্দ করতে এসে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় সমস্যা তৈরি না করেন, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
সৌন্দর্যে মুগ্ধ দর্শনার্থীরাও
স্থানীয়দের অভিযোগের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের মধ্য থেকেও অনিয়ন্ত্রিত আচরণের বিষয়টি উঠে এসেছে। দর্শনার্থী মুমিনুল ইসলাম (২৮) বলেন, আমরা এখানে ঘুরতে এসে দেখলাম, স্থানীয় বাসিন্দারা অনেকটাই বিরক্ত। বিভিন্ন অজুহাতে অনেক দর্শনার্থী তাদের বাড়িতে ঢুকে পড়ছেন। আবার জরুরি প্রয়োজনে কেউ কেউ স্থানীয়দের টয়লেট ব্যবহার করছেন। ঠিক ওই সময় কিছু তরুণ ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে বিভিন্নভাবে ছবি তোলার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
তবে মিডলচরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ দর্শনার্থীর সংখ্যাও কম নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি, রিলস ও ভিডিওতে জায়গাটির সৌন্দর্য রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের নজর কেড়েছে। অনেকে এটিকে ‘রাজশাহীর মিনি সুইজারল্যান্ড’বলছেন।
রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বন্ধুদের নিয়ে মিডলচরে ঘুরতে এসে বলেন, চরটি খোলা জানালার মতো—এখানে এলে মন জুড়িয়ে যায়। শহরের কাছেই হওয়ায় অল্প সময়েই ঘুরে আসা যায়।
রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পাশ্ববর্তী এলাকার আইনজীবী সোহাগ বান্না সোহাগ বলেন, নদী, চর ও নৌকা ভ্রমণের সমন্বয়ে জায়গাটি অসাধারণ। পরিবার নিয়ে এসে বাচ্চারাও অনেক আনন্দ করেছে।
পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা
পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে মিডলচর রাজশাহীর পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। নিরাপদ নৌযাত্রা, পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা, পরিচ্ছন্নতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে পর্যটনবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া হলে জায়গাটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের নির্দেশনায় নৌকার মাঝিদের মধ্যে লাইফ জ্যাকেট বিতরণ করা হয়েছে। রাসিকের সচিব সোহেল রানার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল মাঝিদের হাতে এসব লাইফ জ্যাকেট তুলে দেয়। এ সময় নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী না তোলা, যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে মাঝিদের সচেতন করা হয়। উপস্থিত ছিলেন রাসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল আলমসহ অন্য কর্মকর্তারা।
নিরাপত্তায় জোর পুলিশের
রাজশাহী অঞ্চলের নৌ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন কালবেলাকে বলেন, পদ্মা নদীতে এখন ভরা মৌসুম। তাই যাত্রীদের সতর্ক করা হচ্ছে। অনেক যাত্রী লাইফ জ্যাকেট নিতে চান না। তবে তাদের সচেতন করার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে নৌকার মাঝিদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাত্রীরা যেন লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করেন। লাইফ জ্যাকেট ছাড়া কোনো নৌকা না ছাড়ার বিষয়েও বলা হয়েছে। তিনি বলেন, দর্শনার্থী ও স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। পর্যটনের বিষয়টি পুলিশের মূল দায়িত্বের মধ্যে না পড়লেও সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর।
রাজশাহী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ও মুখপাত্র সাবিনা ইয়াসমিন কালবেলাকে বলেন, মিডলচরে দর্শনার্থীদের যাতায়াত বাড়লেও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অনুমতি ছাড়া কারও বাড়িতে প্রবেশ, হয়রানি কিংবা ড্রোনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিসরে ছবি ধারণের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দর্শনার্থীদেরও স্থানীয়দের প্রতি সম্মান ও দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানান তিনি।
পরিবেশ রক্ষার আহ্বান
রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাছমিনা খাতুন বলেন, মিডলচরের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় দর্শনার্থীদের আরও সচেতন হতে হবে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, প্লাস্টিক ব্যবহার ও কৃষিজমির ক্ষতি থেকে বিরত থাকতে হবে। পরিকল্পিতভাবে পর্যটন গড়ে তুলতে হলে পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, পদ্মার বুকে জেগে ওঠা মিডলচরের সৌন্দর্য ধরে রেখে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে তার আগে দর্শনার্থীদের আচরণ, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, ড্রোন ব্যবহারে শৃঙ্খলা, নৌযাত্রার নিরাপত্তা, কৃষিজমি ও গবাদিপশুর সুরক্ষা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তাদের দাবি, দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মনীতি প্রণয়ন, ড্রোন ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত ভিড়ের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নজরদারির ব্যবস্থা করা হোক। এতে মিডলচরের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও সুরক্ষিত থাকবে।


