
কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু, এক দফায় সরকার পতন; ভয় জয় করে রাজপথে ছাত্র-জনতা, ৫ আগস্টের জনস্রোতে অবসান সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের
ওয়াসিফ ইকবাল; বিশেষ প্রতিবেদনঃ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দুপুর গড়াতেই রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক খবর—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর গণভবনে নেই। মুহূর্তেই ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ গণভবনমুখী হতে শুরু করেন। সড়কে সড়কে নামে মানুষের ঢল। কোথাও উল্লাস, কোথাও অনিশ্চয়তা, কোথাও আবার সংঘর্ষের আশঙ্কা।

কিছু সময় পর সেনাপ্রধানের জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ঘোষণা আসে। ইন্টারনেট সংযোগ ফিরতে শুরু করলে সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়—টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছে। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সূচিত হয় নতুন এক অধ্যায়।
যে পরিবর্তনের লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, জেল-জুলুম ও দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়েছিল, সেই পরিবর্তনের পথ তৈরি হয় শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে।
জুলাই আন্দোলনের সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। আন্দোলনকারীসহ অনেকের কাছে দিনটি পরিচিত হয়ে ওঠে ‘৩৬ জুলাই’ নামে।
কিন্তু এই পরিণতি কি একদিনে এসেছিল?
উত্তর—না।
এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিতর্কিত নির্বাচন, বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক আন্দোলন, গুম-খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং দুর্নীতিকে ঘিরে জনঅসন্তোষ। এসব ক্ষোভের প্রভাব পড়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে। সময়ের সঙ্গে সেই আন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে।
ভয়ডরহীন আন্দোলনে ভেঙে পড়ে দীর্ঘদিনের শাসন
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। এরপর ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মহল প্রশ্ন তোলে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, নির্বাচনব্যবস্থা, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিভিন্ন মেগা প্রকল্পকে উন্নয়নের বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগ করে আসছিল।
২০২৩ সালের শেষ ভাগ ও ২০২৪ সালের শুরুতে বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত ফল না আনলেও জনমনে অসন্তোষের একটি স্তর তৈরি হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। সেই অসন্তোষ যেন বড় কোনো ঘটনার অপেক্ষায় ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, “২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি অর্গানিক অভ্যুত্থান, যেখানে আপামর জনসাধারণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। সরকার এটিকে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ হিসেবে না দেখে একটি ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে বিবেচনা করেছিল এবং আন্দোলনের প্রকৃত গতিপ্রকৃতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল।”
আদালতের রায়ে জেগে ওঠে সুপ্ত ক্ষোভ
২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহালসংক্রান্ত উচ্চ আদালতের একটি রায় সামনে আসে। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ এবং কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দ্রুত আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথমদিকে কর্মসূচি ছিল ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও সড়ক অবরোধ। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত আন্দোলন মূলত কোটা সংস্কারের দাবিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা, শিক্ষার্থীদের আহত হওয়া এবং পরে প্রাণহানির ঘটনা আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষ শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানাতে শুরু করেন। অভিভাবকরা রাস্তায় নামেন। শিক্ষকরা বিবৃতি দেন। আইনজীবী, চিকিৎসক, শিল্পী, লেখক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান।
একপর্যায়ে আন্দোলনের স্লোগান আর শুধু কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের পদত্যাগের দাবিও সামনে আসে।
কোটা ছিল স্ফুলিঙ্গ, ক্ষোভ জমেছিল বহুদিন
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোটা ছিল আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ; কিন্তু বিস্ফোরণের উপাদান অনেক আগেই জমা হয়েছিল।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, বিরোধী দলগুলোর সীমিত রাজনৈতিক কার্যক্রম, মূল্যস্ফীতি, তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকট, প্রশাসনের ওপর আস্থাহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
এর মধ্যে ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে নতুন মোড় আসে। মধ্যরাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা আন্দোলনকে আরও উত্তপ্ত করে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ বাড়তে থাকে। পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আন্দোলনকারী এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের খবর আসে। সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড় বাড়তে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আহত শিক্ষার্থীদের ছবি, রক্তাক্ত ভিডিও এবং স্বজন হারানো পরিবারের কান্না দেশজুড়ে ক্ষোভ ও আবেগ তৈরি করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার দেশব্যাপী কারফিউ জারি করে। মোবাইল ইন্টারনেট এবং পরে ব্রডব্যান্ড সংযোগও বন্ধ করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে তখন রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও আন্দোলন থামেনি। মানুষ মুখে মুখে খবর আদান-প্রদান করে, স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করে এবং নতুন কর্মসূচি বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখে।
পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক মহলের নজরও পড়ে বাংলাদেশের দিকে। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ সহিংসতা বন্ধ, সংযম প্রদর্শন ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানায়।
৩ আগস্ট: এক দফার অপেক্ষায় পুরো দেশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ৩ আগস্ট। সেদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে ঘোষণা করা হয় ঐতিহাসিক এক দফা।
এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের গতিপথ বদলে যায় এবং গণঅভ্যুত্থানের শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে সেদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় নেমেছিল মানুষের ঢল। ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশ থেকে আসে সরকার পতনের এক দফা দাবি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক তারিক মনজুর বলেন, “২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ভয়কে জয় করে বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক হয়েছিল গোটা দেশ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো ছাত্র-জনতার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা। সেদিন থেকেই ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা।”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, শুরুতে তাদের পরিকল্পনা ছিল সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া। এর অধীনে সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতার জন্য একাধিক সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা তৈরির কথাও ভাবা হয়েছিল।
তিনি বলেন, আন্দোলনটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল।
তৎকালীন সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, সরকার পতনের এক দফা ঘোষণার আগে মূল সমন্বয়কদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক হয়। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও এক দফার ভাষা নির্ধারণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছিল।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, ৩ আগস্ট শহীদ মিনারের অভূতপূর্ব জনসমাগম আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয়। সেখান থেকেই সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির ব্যাপক জনসমর্থন তৈরি হয়, যা পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি গড়ে দেয়।

একদিন এগিয়ে আসে ‘মার্চ ফর ঢাকা’
আগস্টের শুরুতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘মার্চ ফর ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। এটি ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী কর্মসূচিগুলোর একটি।
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ রাজধানীর উদ্দেশে রওনা দেন। কেউ বাসে, কেউ ট্রাকে, কেউ মোটরসাইকেলে, আবার অনেকে হেঁটেও ঢাকার দিকে যাত্রা করেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যারিকেড, যান চলাচলে নিয়ন্ত্রণ ও নানা বাধার মধ্যেও হাজার হাজার মানুষ রাজধানীতে প্রবেশ করেন।
আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য ছিল গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা। তখন আর প্রশ্ন ছিল না—কোটা থাকবে কি থাকবে না। প্রশ্ন ছিল, সরকার টিকে থাকবে, নাকি ইতিহাস নতুন মোড় নেবে।
৫ আগস্ট: রাজধানীমুখী জনস্রোত
৫ আগস্ট সূর্য ওঠার আগেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীমুখী মানুষের ঢল আরও তীব্র হয়ে ওঠে। আগের রাতেই ‘মার্চ ফর ঢাকা’ কর্মসূচি এগিয়ে আনার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
সরকারের পক্ষ থেকে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয় এবং কোথাও কোথাও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু জনস্রোত থামানো যায়নি।
ভোর থেকেই গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদীসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।
একই সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে একত্রিত হতে শুরু করেন। শাহবাগ, বাংলামোটর, ফার্মগেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নীলক্ষেত, পল্টন, প্রেস ক্লাব, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়তে থাকে আন্দোলনকারীদের উপস্থিতি।
আন্দোলনকারীদের বড় অংশ গণভবন অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত হয়। কেউ জাতীয় পতাকা হাতে, কেউ ব্যানার নিয়ে, কেউ আবার খালি হাতেই রাজপথে নামেন।
ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, “রাজনৈতিক দলকে দমানো গেলেও জাগ্রত জনতাকে গুলি করে থামানো সম্ভব হয় না। আন্দোলন দমনের নামে নিপীড়ন ও সহিংসতার ছবি-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় ঘরে বসে থাকা মানুষও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ পরিস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রা দেয়।”
‘শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন’—খবরে জনতার দখলে রাজপথ
দুপুরের দিকে রাজধানীতে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর গণভবনে নেই। প্রথমে খবরটি নিশ্চিত না হলেও কিছু সময়ের মধ্যে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে তাঁর সরকারি বাসভবন ত্যাগের খবর প্রকাশ হতে শুরু করে।
এরপর নিশ্চিত হয়, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়েছেন।
খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উল্লাস শুরু হয়। মানুষ রাস্তায় নেমে বিজয় মিছিল করেন। একই সময়ে কোথাও কোথাও সরকারি ও দলীয় স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
পরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ভারতের সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির কারণে শেখ হাসিনা অল্প সময়ের নোটিশে ভারতে আসেন। তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণে ভারতে অস্থায়ীভাবে অবস্থানের অনুমতি চান এবং ভারত মানবিক বিবেচনায় সেই সুযোগ দেয়।
নতুন বাঁকে বাংলাদেশ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্ট শুধু একটি সরকারের পতনের দিন নয়; এটি ছিল দীর্ঘদিনের একটি ক্ষমতাকাঠামোর ভেঙে পড়ার প্রতীক।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের স্মৃতি এখনো মনে করিয়ে দেয় রক্তাক্ত রাজপথ, শোকাহত পরিবার, হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, ইন্টারনেটবিহীন নিস্তব্ধ শহর এবং রাজপথে নেমে আসা লাখো মানুষের কথা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম আলী রেজা বলেন, “পুরোনো বন্দোবস্তের বিপরীতে জুলাই আন্দোলন পরিবর্তন ও সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশকে নতুন এক বাঁকে দাঁড় করিয়েছে।”
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকার গণতন্ত্র ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে ক্ষমতায় টিকে থাকা সহজ হবে না—জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই বার্তাও দিয়ে গেছে।
তবে ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের মতো জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়েও বিতর্ক থাকবে বলে মনে করেন তিনি। কারণ যে পরিবর্তন ও সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা থেকে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ঐক্য কতটা টেকসই থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাই শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের দিন নয়। এটি ছিল ভয়কে জয় করে রাজপথে নেমে আসা মানুষের দিন; দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণের দিন; এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশের ইতিহাস নতুন পথে মোড় নেওয়ার দিন।


