
প্রাণ বাঁচানোর স্বপ্নে পথচলা শুরু এক তরুণের। সড়কে প্রতিদিনের মৃত্যুর মিছিল তাকে ভাবিয়েছে, কষ্ট দিয়েছে। সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নিয়েছে এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন—‘হেলমেট এমকিউ-থ্রি’ প্রযুক্তি। রাজশাহীর মুশফিকুর রহমান নাফিসের তৈরি এই হেলমেট না পরলে মোটরসাইকেল স্টার্টই নেবে না; আর চালক যদি অ্যালকোহল গ্রহণ করেন, তাহলে থেমে যাবে বাইকের ইঞ্জিন। দুর্ঘটনা ঘটলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই খবর পৌঁছে যাবে নির্দিষ্ট ঠিকানায়। তরুণ নাফিসের এই প্রযুক্তি আজ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে, এনে দিয়েছে স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক।

হেলমেট এমকিউ-থ্রিঃ দুর্ঘটনা রোধে স্মার্ট সমাধান। সড়কে নামলে মোটরসাইকেল চালক ও আরোহীদের হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেকেই তা মানতে গড়িমসি করেন। এতে দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি ও প্রাণহানির হার বেড়েই চলছে। এই বাস্তবতায় নাফিসের উদ্ভাবিত ‘হেলমেট এমকিউ-থ্রি’ প্রযুক্তি এক অনন্য সমাধান হয়ে এসেছে।এই প্রযুক্তি নিশ্চিত করবে—চালক হেলমেট না পরলে মোটরসাইকেল স্টার্ট নেবে না, পরলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইঞ্জিন চালু হবে। হেলমেটের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে সেন্সর, যা চালকের উপস্থিতি শনাক্ত করে।
অ্যালকোহল ডিটেকশন ও দুর্ঘটনা অ্যালার্ট সিস্টেমঃ নাফিসের উদ্ভাবনে যুক্ত রয়েছে অ্যালকোহল সেন্সরও। যদি চালক মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণ করেন, সেন্সর তা শনাক্ত করে সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন বন্ধ করে দেবে। পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটলে হেলমেটের ‘অটো অ্যালার্ট সিস্টেম’ নির্দিষ্ট ফোন নম্বর বা লোকেশনে তাৎক্ষণিকভাবে বার্তা পাঠিয়ে দেবে। এতে আহত চালককে দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। নাফিস বলেন,“প্রতি বছর হাজারো তরুণ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তাদের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। তাই এমন একটি প্রযুক্তি বানিয়েছি, যা হেলমেট না পরলে বাইক স্টার্টই নেবে না।”
দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বজয়ঃ এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নাফিস শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাড়া ফেলেছেন। ২০২৫ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ইনোভেশন কম্পিটিশন অ্যান্ড এক্সিবিশনে’ তিনি সিলভার মেডেল অর্জন করেন। এর আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের বিশ্ব উদ্ভাবন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীতে জিতে নিয়েছিলেন গোল্ড মেডেল। জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ৩০০টি দলের মধ্যে নাফিসের দল ‘টিম ডেল্টা ভোল্ট’ আন্তর্জাতিক পর্বের জন্য মনোনীত হয়।
শৈশব থেকেই উদ্ভাবনের ঝোঁকঃ নাফিসের মা মমতাজ রহমান বলেন,“ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই যন্ত্রপাতি খুলে আবার জোড়া লাগানো ছিল ওর খেলা। তখনই বুঝেছিলাম, ছেলে বড় হয়ে কিছু না কিছু উদ্ভাবন করবে।” নাফিসের উদ্ভাবনী যাত্রা শুরু হয় নবম শ্রেণিতে রোবটিকস প্রকল্প দিয়ে। ২০২১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান ক্লাব আয়োজিত প্রতিযোগিতায় তার ‘স্মার্ট ক্লিনিং বট’ প্রকল্প প্রথম স্থান অর্জন করে। এরপর তৈরি করেন ফায়ার ফাইটিং বোট, ব্লাইন্ডিং স্টিক, আর্থকোয়াক ডিটেক্টর, এবং হাঁটার শক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা।
সাফল্যের ধারাবাহিক অর্জনঃ ২০২৩ সালে দীপ্ত টিভির আয়োজনে খুদে বিজ্ঞানী অ্যাওয়ার্ড পান নাফিস। ২০২৪ সালে আইসিটি ডিভিশনের ন্যাশনাল স্টিম অলিম্পিয়াডে ফাইনালিস্ট হন। একই বছরে রাজশাহী কলেজ বিজ্ঞান উৎসবে হন চ্যাম্পিয়ন। ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে অর্জন করেন রৌপ্য পদক।
শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নঃ নাফিস ২০২০ সালে শহীদ মামুন মাহমুদ পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসিতে জিপিএ ৫.০০ পান।এরপর রাজশাহী সরকারি পলিটেকনিকে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগে ভর্তি হয়ে ২০২৪ সালে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। বর্তমানে তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে সিএসই বিভাগে বিএসসি অধ্যয়নরত।
নিজের স্বপ্ন সম্পর্কে নাফিস বলেন, “আমি চাই আমার প্রকল্পগুলো বাস্তবে রূপ পাক। ভবিষ্যতে এমন একটি রোবট তৈরি করতে চাই, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নগরীর রাস্তা পরিষ্কার করবে। মানুষের পাঁচজনের কাজ একাই করতে পারবে এই রোবট।” তার বাবা মাসুদুর রহমান ইমন, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, বলেন, “ছেলে যেন আরও নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে দেশকে এগিয়ে নিতে পারে—এইটাই আমার স্বপ্ন।”
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের অনুপ্রেরণাঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৩২ দশমিক ১৪ শতাংশই মোটরসাইকেল আরোহী। এই ভয়াবহ বাস্তবতায় নাফিসের ‘হেলমেট এমকিউ-থ্রি’ প্রযুক্তি শুধু একটি উদ্ভাবন নয়—এটি হতে পারে একটি জীবনরক্ষাকারী বিপ্লব।


