
শেষ বাঁশি বাজতেই মনে হলো, যেন এক বিশাল সাম্রাজ্যের প্রাসাদের শেষ ইটটাও খসে পড়েছে। নিউ জার্সির গ্যালারিতে হাজারো হলুদ জার্সি তখন আর ফুটবল দেখছিল না, তারা দেখছিল এক স্বপ্নের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। কেউ দুই হাতে মুখ ঢেকেছেন, কেউ চোখের জল লুকাতে ব্যর্থ। শূন্য দৃষ্টিতে মাঠের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ব্রাজিলের সমর্থকরা। কষ্টের কান্নায় শেষ হলো তাদের বিশ্বকাপ মিশন। মাঠের মাঝখানে ব্রাজিলের ফুটবলাররা স্থির দাঁড়িয়ে, আর দূরে লাল জার্সিতে উল্লাসে মেতে উঠেছে নরওয়ে। বিশ্বকাপের আগে যাদের নিয়ে খুব বেশি আলোচনা ছিল না, সেই নরওয়েই বিশ্ব ফুটবলের নতুন শক্তি হয়ে উঠে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। আর হেক্সার স্বপ্ন—সেটি ভেঙে চুরমার হয়ে পড়ে রইল আর্লিং হালান্ডের মাথা আর বাঁ পায়ের নিচে।
২-১ গোলের এই হারেই শেষ হলো ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্ন। ৭৯ মিনিটে হালান্ডের দুর্দান্ত হেডে এগিয়ে যায় নরওয়ে। এরপর বাঁ পায়ের দুর্বার এক ভলিতে দ্বিতীয়বার আলিসনকে পরাস্ত করেন তিনি। যোগ করা সময়ে নেইমার পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করলেও ততক্ষণে গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হয়ে গেছে। টানা ছয়টি বিশ্বকাপ ধরে যে ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি ব্রাজিল, এবারও সেই গল্পই পুনরাবৃত্তি হলো।

ম্যাচের আগে ব্রাজিল শিবিরে কথা ছিল, এবার লেখা হবে নতুন গল্প। যে গল্পে থাকবে নরওয়েকে প্রথমবার হারানোর গৌরব। কারণ, এর আগে দুই দলের দেখায় ব্রাজিল কখনোই জিততে পারেনি। কিন্তু ইতিহাসের বইয়ে নতুন অধ্যায় যোগ করার বদলে পুরোনো অভিশাপকেই আরও গাঢ় করল সেলেসাওরা। নরওয়ে আবারও ব্রাজিলের কাছে অজেয় রইল, আর বিদায় নিল পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
ব্রাজিলের পতনের বীজ অবশ্য বোনা হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। প্রথমার্ধেই তারা ম্যাচ শেষ করে দিতে পারত। ১৪ মিনিটে ব্রুনো গিমারায়েস পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন। ওরিয়ান নিল্যান্ডের দুর্দান্ত সেভে বেঁচে যায় নরওয়ে। এরপর ভিনিসিয়ুস, মার্তিনেলি—একজনের পর একজন সুযোগ নষ্ট করেছেন। বিরতির আগেই অন্তত দুই গোলের ব্যবধান গড়ে নেওয়ার মতো সুযোগ তৈরি করেও গোলশূন্য থেকে যায় ব্রাজিল।
দ্বিতীয়ার্ধে ভুলগুলোর মাশুল আরও স্পষ্টভাবে দিতে হয় সেলেসাওদের। ভিনিসিয়ুসের অসাধারণ দুটি পাস থেকে একা গোলরক্ষকের সামনে গিয়েও এনদ্রিক গোল করতে পারেননি। প্রথমবার দুর্বল শটে, দ্বিতীয়বার ভারী টাচে নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করেন তিনি। বড় ম্যাচে এমন ভুলের মূল্য যে কতটা নির্মম হতে পারে, সেটাই পরে বুঝেছে ব্রাজিল।
কেবল ফিনিশিং নয়, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানোও ডুবিয়েছে সেলেসাওদের। বল দখলে এগিয়ে থেকেও খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি তারা। ভুল পাস, ধীর বিল্ড-আপ আর রক্ষণে ট্রানজিশনের সময় বারবার ফাঁকা জায়গা ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নিয়েছে নরওয়ে। ব্রাজিলের রক্ষণভাগের পেছনে তৈরি হওয়া সেই শূন্যস্থানেই বারবার ছুটে এসেছেন হালান্ড, নুসা ও সোরলোথ। নরওয়ের পরিকল্পনা ছিল সহজ—বল জিতো, দ্রুত সামনে যাও, আর গতির লড়াইয়ে ব্রাজিলকে হারিয়ে দাও। সেই পরিকল্পনাই নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করেছে তারা।
যাকে নিয়ে ম্যাচের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনা, শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠলেন সবচেয়ে বড় পার্থক্য। প্রথমার্ধে অনেকটা বিচ্ছিন্ন থাকা হালান্ড ধৈর্য হারাননি। সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। ৭৯ মিনিটে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের নিখুঁত ক্রসে গ্যাব্রিয়েলকে হারিয়ে হেডে প্রথম গোল করেন। ঠিক ১১ মিনিট পর সেই শেলদেরুপের আরেকটি নিখুঁত পাসে বাঁ পায়ের ভলিতে দ্বিতীয় গোল করে হালান্ড জানিয়ে দিলেন কেন তিনি বিশ্বসেরা স্ট্রাইকার। সেই এক ভলিতেই ভেঙে পড়ে ব্রাজিলের হেক্সা স্বপ্ন।
এই দুই গোলের সুবাদে বিশ্বকাপে হালান্ডের গোলসংখ্যা দাঁড়াল সাত। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে তিনি এখন সমানতালে আছেন মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে। তিনজনের ঝুলিতেই এখন সাতটি করে গোল। তবে এই রাত শুধু তার ব্যক্তিগত কৃতিত্বের নয়, এটি নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসেরও এক নতুন অধ্যায়।
বিশ্বকাপ শুরুর আগে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ব্রাজিল, স্পেন কিংবা ইংল্যান্ড। নরওয়ের নাম সেখানে খুব কমই উচ্চারিত হয়েছে। অথচ মাঠের ফুটবল আবারও মনে করিয়ে দিল, নাম নয়, মাঠের পারফরম্যান্সই ইতিহাস লেখে। শৃঙ্খলা, গতি আর বিশ্বাস—এই তিন অস্ত্র নিয়ে তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে উঠে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে।
ব্রাজিলের জন্য এই বিদায় শুধু আরেকটি পরাজয় নয়। এটি টানা ছয়টি বিশ্বকাপ ধরে জমে থাকা অপূর্ণতার আরেকটি দীর্ঘশ্বাস। প্রতিভা ছিল, সুযোগ ছিল, তারকার অভাব ছিল না—অভাব ছিল চাপের মুহূর্তে নির্মম হয়ে ওঠার। ফুটবল বারবার একই শিক্ষা দেয়—ইতিহাসের ভার কাঁধে নিয়ে মাঠে নামা যায়, কিন্তু নতুন ইতিহাস লিখতে হলে সুযোগগুলোকে গোলে পরিণত করতেই হয়। ব্রাজিল সেই পরীক্ষায় আবারও ব্যর্থ হলো।
আর ভাইকিং রোরের বুক কাঁপানো স্লোগান দিতে দিতে নরওয়ে লিখে ফেলল এমন এক গল্প, যা বিশ্ব ফুটবল বহুদিন মনে রাখবে।


