
এসএসসিতে রাজশাহী বোর্ডে ধস: পাসের হার ৬৩.৬৭%
এক বছরে পাসের হার কমেছে ১৩.৯৬ শতাংশ, শূন্য পাসের স্কুল ৫
জিপিএ-৫ও তলানিতে, শতভাগ পাসের স্কুল কমল ৬৪টি
রাজশাহী বোর্ডে ফলের বিপর্যয়: ছেলেদের পাস ৫৭%, মেয়েদের ৭১%
পরীক্ষায় অংশ নেয় ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪ জন, উত্তীর্ণ ১ লাখ ১২ হাজার ৮৬ শিক্ষার্থী
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধস নেমেছে। সাত বছরের তুলনামূলক হিসাবে এবারই সর্বনিম্ন পাসের হার। ২০২৬ সালে বোর্ডে পাসের হার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৭৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে প্রায় ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ পয়েন্ট।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১০টায় সারাদেশের সঙ্গে একযোগে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। ফল প্রকাশের পর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটসহ নির্ধারিত অনলাইন মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ফল জানতে পারে।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীন রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার শিক্ষার্থীরা এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
বোর্ডের সাত বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালে পাসের হার ছিল সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। সেই তুলনায় এবার কমেছে প্রায় ২৮ শতাংশ পয়েন্ট।
ফলাফলে শুধু পাসের হার নয়, জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাতেও বড় পতন হয়েছে। ২০২৬ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ৬১৩ জন। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২২ হাজার ৩২৭ জন। এক বছরে জিপিএ-৫ কমেছে ৫ হাজার ৭১৪ জন।
বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফলেও দেখা গেছে বড় পরিবর্তন। ২০২৫ সালে কোনো বিদ্যালয়ে শূন্য শতাংশ পাস না থাকলেও এবার ৫টি বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি। একই সঙ্গে ০ থেকে ১০ শতাংশ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১টিতে।
অন্যদিকে গত বছর শতভাগ পাস করা বিদ্যালয় ছিল ৯৯টি। এবার তা কমে হয়েছে মাত্র ৩৫টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা বিদ্যালয় কমেছে ৬৪টি।
ছাত্র-ছাত্রীদের ফলাফলেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান। এবার ছাত্রীদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ, আর ছাত্রদের ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ ছাত্রীদের পাসের হার ছাত্রদের চেয়ে ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
সাত বছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বলছে, রাজশাহী বোর্ডের এসএসসি ফলাফলে এবার একসঙ্গে পাসের হার, জিপিএ-৫ এবং শতভাগ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা কমেছে। বিপরীতে শূন্য ও অত্যন্ত কম পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে। ফলে ফলাফলের এমন অবনতির কারণ খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
শুধু তাই নয়, ২০২১ সালে যেখানে রাজশাহী বোর্ডে পাসের হার ছিল ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ, সেখানে ২০২৬ সালে তা নেমেছে ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৩১ দশমিক ০৪ শতাংশ পয়েন্ট। সাত বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ফলাফলই সবচেয়ে নিচে।
বোর্ডের প্রকাশিত সাত বছরের তুলনামূলক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে ফলাফলের এই পতনের পাশাপাশি জিপিএ-৫, শতভাগ পাস করা বিদ্যালয় এবং অত্যন্ত কম পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যাতেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে।
তথ্য বলছে, ২০২১ সালে সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯৪ দশমিক ৭১ শতাংশ পাসের পর ২০২২ সালে তা কমে ৮৫ দশমিক ৮৮ শতাংশে নামে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে কিছুটা বাড়লেও ২০২৫ সালে বড় পতন ঘটে। এবার সেই পতন আরও তীব্র হয়েছে।
অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৮৯ দশমিক ২৬ শতাংশ থেকে দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালে পাসের হার কমেছে ২৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ পয়েন্ট।
জিপিএ-৫-এও ধস
পাসের হারের পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাতেও বড় পতন হয়েছে। ২০২৬ সালে রাজশাহী বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৬ হাজার ১১৩ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ২২ হাজার ৩২৭। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে ৬ হাজার ২১৪ জন, যা প্রায় ২৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
আর সাত বছরের মধ্যে জিপিএ-৫-এর সর্বোচ্চ সংখ্যা ছিল ২০২২ সালে—৪২ হাজার ৫১৭ জন। সেই বছরের তুলনায় ২০২৬ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে ২৬ হাজার ৪০৪ জন, অর্থাৎ প্রায় ৬২ দশমিক ১০ শতাংশ। এখানেও ২০২৬ সালের সংখ্যা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ছেলেদের ফলাফলে পতন বেশি
ডাটার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ছাত্র ও ছাত্রীদের ফলাফলের ব্যবধান।
২০২৬ সালে ছাত্রীদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। বিপরীতে ছাত্রদের পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের পাসের হার ১৩ দশমিক ৪০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। ২০২৫ সালে ছাত্রীদের পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ০১ শতাংশ এবং ছাত্রদের ৭৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরে—ছাত্রীদের পাসের হার কমেছে ১১ দশমিক ২৮ পয়েন্ট এবং ছাত্রদের পাসের হার কমেছে ১৬ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট। অর্থাৎ ছাত্রদের ফলাফলের অবনমন ছাত্রীদের তুলনায় আরও বেশি। এটি রাজশাহী বোর্ডের ফলাফল বিশ্লেষণে বিশেষভাবে নজর দেওয়ার মতো বিষয়।
১০০ শতাংশ পাসের স্কুল কমেছে ৬৪টি
ফলাফলের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দেখা যাচ্ছে বিদ্যালয়ভিত্তিক পরিসংখ্যানে। ২০২৫ সালে রাজশাহী বোর্ডে ৯৯টি বিদ্যালয়ের শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৫টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা বিদ্যালয় কমেছে ৬৪টি। শুধু সংখ্যাগত পতন নয়, শতাংশের হিসাবে এই হ্রাস প্রায় ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
শূন্য পাসের স্কুল ৫, ১০ শতাংশের নিচে ১১ টি স্কুল
২০২৫ সালে রাজশাহী বোর্ডে শূন্য শতাংশ পাস করা কোনো বিদ্যালয় ছিল না। একইভাবে ০ থেকে ১০ শতাংশ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যাও ছিল শূন্য। কিন্তু ২০২৬ সালে—শূন্য পাসের বিদ্যালয় ৫টি। আর ০ থেকে ১০ শতাংশ পাস করেছে—এমন বিদ্যালয় ১১টি। অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফলাফলে মোট ১৬টি বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে পাসের হার ১০ শতাংশের বেশি নয়। এটি সামগ্রিক ফলাফলের পতনের পাশাপাশি বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার মান ও ফলাফল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।
পরীক্ষার্থী কমেছে, অনুপস্থিতিও বেড়েছে
সাত বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৫২ জন। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় উপস্থিত ছিল ১ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪ জন এবং অনুপস্থিত ছিল ২ হাজার ৯০৮ জন। ২০২৫ সালে পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৭৯২ জন। উপস্থিত ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার ৩১০ এবং অনুপস্থিত ছিল ২ হাজার ৪৮২ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমেছে, কিন্তু অনুপস্থিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে।
সাত বছরের ডাটায় ২০২৬-এর অবস্থান কোথায়? যে প্রশ্নগুলো সামনে আসছে
সাত বছরের পরিসংখ্যান বলছে, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল শুধু একটি বছরের ফল খারাপ হওয়ার ঘটনা নয়; বরং কয়েকটি সূচকে একসঙ্গে অবনমন ঘটেছে। পাসের হার কমেছে, জিপিএ-৫ কমেছে, শতভাগ পাসের বিদ্যালয় কমেছে এবং একই সঙ্গে শূন্য বা অত্যন্ত কম পাসের বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে।
ফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ইফফাত জেরীনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। সাত বছরের মধ্যে এবারই সর্বনিম্ন পাসের হার—এর কারণ জানতে চাইলে তিনি অফিসে গিয়ে বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তবে ফলাফলকে ‘বিপর্যয়’ বলতে নারাজ রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী। কালবেলাকে তিনি বলেন, আমি এই ফলাফলকে বিপর্যয় বলব না। বরং আজকের ফলাফল একটি স্ট্যান্ডার্ড ফলাফল। পরীক্ষার্থীদের যোগ্যতার ভিত্তিতেই প্রকৃত ফলাফল হয়েছে। যারা পড়াশোনা করেছে, তারাই ভালো ফলাফল পেয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ কালবেলাকে জানান, ফলাফলের এই পতনকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে হবে না। এর পেছনে শিক্ষার মান, পাঠদানের পদ্ধতি, শিক্ষার্থী-শিক্ষকের সম্পর্ক এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থাসহ একাধিক কারণ থাকতে পারে। সাত বছরের পরিসংখ্যানে যে ধারাবাহিক অবনমন দেখা যাচ্ছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এখন প্রশ্ন উঠছে—কেন এমন হলো?
শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে ঘাটতি, বিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠদানের মান, শিক্ষকের উপস্থিতি ও পাঠদান, কোচিংনির্ভরতা, মূল্যায়ন পদ্ধতি, পরীক্ষার প্রশ্নের মান, নাকি শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া—কোন বিষয়টি এই বড় পতনের পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে? বিশেষ করে ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মাত্র এক বছরে পাসের হার প্রায় ১৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ পয়েন্ট কমে যাওয়ার কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি।
একই সঙ্গে ২০২৫ সালে যেখানে কোনো শূন্য পাসের বিদ্যালয় ছিল না, সেখানে এক বছর পর ৫টি বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীও পাস না করা এবং ১০০ শতাংশ পাস করা বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৯ থেকে ৩৫-এ নেমে আসা শিক্ষা প্রশাসনের জন্য বড় সতর্কবার্তা।



