
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীদের হল ফি ও সংশ্লিষ্ট খাতে বকেয়া ৭২ লাখ টাকার বেশি ছাড়িয়েছে। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালায় তিন মাসের বেশি হল ফি বকেয়া থাকলে আবাসিক সিট বাতিলের বিধান রয়েছে। বাস্তবে সেই নিয়ম কার্যকর না হওয়ায় বছরের পর বছর বকেয়া জমেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) সরজমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ঘুরে, সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়মিত তদারকির অভাব, শিথিল প্রশাসনিক অবস্থান এবং পুরোনো পদ্ধতিতে ফি আদায়ের কারণে এই বিপুল অঙ্কের বকেয়া সৃষ্টি হয়েছে। এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু এবং বকেয়া থাকলে পরীক্ষার নিবন্ধন বন্ধের মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে প্রশাসন।

সিট বাতিলের বিধান কার্যকর না হওয়ায় বছরের পর বছর জমছে হল ফি
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক হলে। এই হলের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়যোগ্য অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ টাকা। এছাড়া শহীদ লে. সেলিম হলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৫ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বকেয়া হয়েছে ১৩ লাখ ২২ হাজার ৮৮০ টাকা। শহীদ আব্দুল হামিদ হলে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হলে প্রায় ১১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে।
অন্য হলগুলোর মধ্যে শহীদ শহিদুল ইসলাম হলে প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা, ছাত্র হল-১-এ প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা, টিনশেড হলে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং ছাত্রী হল-২-এ প্রায় ১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। ছাত্রী হল-১-এ বর্তমানে কোনো বকেয়া নেই। তবে ছাত্র হল-২-এর বকেয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল নীতিমালায় তিন মাসের বেশি হল ফি বকেয়া থাকলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর সিট বাতিল করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই বিধান বছরের পর বছর কার্যকর করা হয়নি। ফলে অনেক শিক্ষার্থী ছয় মাস বা তারও বেশি সময় বকেয়া রেখেও হলে অবস্থান করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সিট বাতিলের বিধান কার্যকর করতে গেলে অনেক সময় শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া, মানবিক বিবেচনা এবং প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হয়। ফলে নিয়ম থাকলেও তা বাস্তবায়নে শিথিলতা দেখা যায়। এই সুযোগে প্রতিবছর বকেয়ার পরিমাণ বাড়তে থাকে।
এ বিষয়ে রুয়েটের ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. রবিউল ইসলাম সরকার কালবেলাকে জানান, বকেয়া পরিশোধের জন্য ইতোমধ্যে সব হলে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এরপর কিছু শিক্ষার্থী তাদের বকেয়া পরিশোধ করেছে। হলের নীতিমালা অনুযায়ী তিন মাসের বেশি বকেয়া রাখার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে ছয় মাসেরও বেশি সময়ের বকেয়া আমরা দেখতে পাচ্ছি।
তিনি বলেন, এ সমস্যার সমাধানে অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। পাশাপাশি হলে বেতন বকেয়া থাকলে পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশন সুবিধা বাতিলের বিষয়টি একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদন হয়েছে। আগামী মাস থেকেই অনলাইন রেজিস্ট্রেশন, অনলাইন হল কুপন এবং সব ধরনের পেমেন্ট অনলাইনে চালু হবে। এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের বকেয়া রাখার সুযোগ থাকবে না বলে আশা করছি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এতদিন ফি আদায়ের পুরো প্রক্রিয়া অনেকটাই ম্যানুয়াল হওয়ায় নিয়মিত তদারকি ও বকেয়া পর্যবেক্ষণে ঘাটতি ছিল। ফলে কে কত মাসের বকেয়া রেখেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে সেটি নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়ে পড়ত। নতুন অনলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বকেয়া তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত হবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করলে প্রশাসন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সূত্র বলছে, শুধু প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যমান নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন এবং বকেয়া আদায়ে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও একই সংকট ফিরে আসতে পারে। বর্তমানে ৭২ লাখ টাকার বেশি বকেয়ার ঘটনা সেই বাস্তবতারই স্পষ্ট প্রতিফলন।


