
গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও ইসরাইলি বাহিনী সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটছে। গাজা উপত্যকাজুড়ে তারা স্থায়ী এবং অত্যন্ত সুরক্ষিত সামরিক ফাঁড়ি বা আউটপোস্ট তৈরি করছে, যা স্পষ্ট ধরা পড়েছে কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটের সাম্প্রতিক চিত্রে। আল জাজিরার ‘ওপেন সোর্স ইউনিট’-এর এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

অনুসন্ধানে মে মাস পর্যন্ত সংগৃহীত স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণ করে গাজার ভেতরে ৪০টি সুনির্দিষ্ট ইসরাইলি সামরিক আউটপোস্টের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, গত বছরের অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর সম্পূর্ণ নতুনভাবে ৮টি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে একটির নির্মাণকাজ এখনও সক্রিয়ভাবে চলছে। অথচ, মার্কিন মধ্যস্থতায় সই হওয়া ওই চুক্তি অনুযায়ী গাজা থেকে সম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহারের বাধ্যবাধকতা ছিল ইসরাইলের।
এই সামরিক অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়টি ইসরাইলি নেতৃত্বের ভূখণ্ড দখলের প্রকাশ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই প্রমাণ করে। সম্প্রতি এক সম্মেলনে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিশ্চিত করেছেন যে, গাজা উপত্যকার সিংহভাগ স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ইসরাইলি বাহিনী বর্তমানে ‘ইয়েলো লাইন’ বা বাফার জোনে অবস্থান নিয়ে গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এ সময় অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণ গাজা অধিভুক্ত করার দাবি উঠলে নেতানিয়াহু বলেন, চলুন ধাপে ধাপে এগোই। প্রথমে ৭০ শতাংশ দিয়ে শুরু করা যাক।
স্যাটেলাইট চিত্রগুলো প্রমাণ করে যে এগুলো কোনো সাময়িক পর্যবেক্ষণ চৌকি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতির জন্য স্থায়ী অবকাঠামো। এই নতুন ঘাঁটিগুলোর মধ্যে দুটি উত্তর গাজায়, দুটি মধ্যাঞ্চলে, একটি নেতজারিম করিডোরের পূর্বে এবং তিনটি দক্ষিণের খান ইউনিস শহরে স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আগ্রাসনের প্রমাণ মিলেছে খান ইউনিসের ‘ইস্টার্ন সেমেট্রি’ বা পূর্ব কবরস্থানে। সেখানে গত নভেম্বরে বুলডোজার দিয়ে কবরস্থানটি গুঁড়িয়ে দিয়ে মে মাসের মাঝামাঝির মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সামরিক যান রাখার জায়গা এবং সেনাদের থাকার জন্য ঘর তৈরি করা হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়াতেও।
নতুন ঘাঁটি তৈরির পাশাপাশি পুরোনো অবস্থানগুলোরও ব্যাপক আধুনিকায়ন ও পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। গাজা সিটির পূর্বে একটি সামরিক ঘাঁটির আয়তন গত অক্টোবর থেকে মে মাসের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ট্যাঙ্কের মতো সাঁজোয়া যান রাখার জন্য সেখানে নতুন জোন তৈরি এবং চারপাশ জুড়ে গভীর প্রতিরক্ষামূলক পরিখা খনন করা হয়েছে। বিশেষ করে গাজার উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে বিচ্ছিন্নকারী ‘নেতজারিম করিডোর’ এলাকায় তিনটি পৃথক আউটপোস্টের মাধ্যমে পুরো গাজার যাতায়াত ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছে ইসরাইলি বাহিনী।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ৪০টি সামরিক ঘাঁটির ভৌগোলিক অবস্থান মূলত ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলোকে অবরুদ্ধ করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল। সামরিক রাস্তা, পরিখা এবং মাটির বাঁধ দিয়ে এই ঘাঁটিগুলোকে এমনভাবে যুক্ত করা হয়েছে, যা ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের স্বাধীনভাবে চলাচল বা নিজেদের জমিতে যাওয়ার অধিকারকে সম্পূর্ণ কেড়ে নিয়েছে।


