
তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের ঘন ঘন আসা-যাওয়ায় রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় জনভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরে নগর থেকে গ্রাম—সবখানেই লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্পকারখানা—কোনো খাতই এর প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষক, শিক্ষার্থী, গৃহিণী, ব্যবসায়ী ও বিদ্যুৎনির্ভর পেশাজীবীরা।
নেসকোর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার দুপুর ৩টায় রাজশাহী বিভাগে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ৫১৬ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে ৪৩২ দশমিক ৮ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৮৩ দশমিক ৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ।

সরবরাহ ঘাটতির প্রভাব পড়ছে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের ওপর। রাজশাহী নগর ও গ্রামাঞ্চলে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। বিশেষ করে তীব্র গরমের মধ্যে রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন পরিবারগুলো।
পবা উপজেলার কৃষক উজ্জ্বল আলী বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় সেচযন্ত্র চালাতে পারছি না। সময়মতো পানি দিতে না পারলে ফসলের ক্ষতি হবে। রাজশাহী নগরের গৃহিণী নূরুন্নাহার বেগম বলেন, গরমের মধ্যে ছোট বাচ্চাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়। কখন বিদ্যুৎ আসবে, তারও ঠিক নেই।
বিদ্যুৎ সংকটে ব্যবসায়ীদেরও ভোগান্তি বাড়ছে। নগরের ব্যবসায়ী সাগর বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে দোকানের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। অনলাইন লেনদেন, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন যন্ত্র চালাতে না পারায় ব্যবসায় লোকসান হচ্ছে।
পাবনা জেলা
রাজশাহীর পাশাপাশি পাবনাতেও বেড়েছে লোডশেডিং। বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিনে চার থেকে পাঁচবার এবং সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত তিন থেকে চারবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। শালগাড়ীয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে ছয় থেকে সাতবার লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতিবার প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও কোনো কোনো সময় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পাবনা নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পাবনা শহরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৩০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ১৫ থেকে ২৫ মেগাওয়াট বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতির কারণে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা
চাঁপাইনবাবগঞ্জেও লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতিদিন দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা এবং রাতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও কোথাও এর চেয়েও বেশি সময় লোডশেডিং হচ্ছে। শিবগঞ্জ উপজেলার বিনোদপুর এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, কোনো কোনো দিন ২৪ ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
এতে রাতের ঘুম, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষিতে সেচ, ব্যবসা-বাণিজ্য, কলকারখানার উৎপাদন এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জ দেওয়াও ব্যাহত হচ্ছে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগও বেড়েছে।
নাটোর জেলা
নাটোরেও একই চিত্র। সদরসহ জেলার সাত উপজেলায় বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানায় লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন সিংড়া উপজেলার বাসিন্দারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে দিন-রাত মিলিয়ে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
সিংড়া পৌর শহরের দর্জি রবিউল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো কাজ ডেলিভারি দিতে পারছি না। গ্রাহকদের কাছ থেকে গালিগালাজ শুনতে হচ্ছে। বিদ্যুৎনির্ভর মেশিন ব্যবহার করে এখন খুব বিপদে আছি।’
নাটোরের পোল্ট্রি খামারিরাও বিদ্যুৎ সংকটে সমস্যায় পড়েছেন। খামারি মাসুদ রানা বলেন, ‘ফ্যান ছাড়া হাঁস-মুরগি পালন করা কঠিন। জেনারেটর চালিয়ে খামার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যায়, কিন্তু বাজারে সেই অনুযায়ী দাম পাওয়া যায় না।’
গুরুদাসপুরের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সেখানে কোনো কোনো এলাকায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এতে সন্ধ্যার আগেই অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে নাটোর সদরের দিঘাপতিয়া এলাকায় বিদ্যুৎ সংকটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন এক শিক্ষক।
বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক বাসিন্দার মোবাইল ফোন ও আইপিএসের ব্যাটারি চার্জ দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও বিদ্যুৎ আসার আগেই আবার চলে যাওয়ায় আইপিএসের ব্যাটারি পুরোপুরি চার্জ হচ্ছে না। ফলে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও কাজে আসছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের।
এদিকে বিদ্যুৎ সংকটের কারণ জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেসকোর এক কর্মকর্তা বলেন, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সরবরাহ বাড়লে পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।
রাজশাহী বিভাগের বাসিন্দাদের অভিযোগ, তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং শুধু স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করছে না, কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে রাতের লোডশেডিংয়ে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের কষ্ট বাড়ছে।
ভুক্তভোগীরা দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি কমিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি এবং নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।


