
রাকিবুল ইসলাম, মোহনপুর (রাজশাহী) প্রতিনিধি: রাজশাহীর মোহনপুরে চলতি মৌসুমে পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত ও কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় এবার পাটের ফলন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে পাটের দামও ভালো থাকায় স্বস্তি ফিরেছে চাষিদের মধ্যে। ফলন ও দাম—দুইয়ে মিলে পাট চাষ করে লাভের মুখ দেখার আশা করছেন কৃষকরা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাট জাগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পানিও পাওয়া গেছে। এতে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পাট প্রক্রিয়াজাত করতে কৃষকদের ভোগান্তি কম হয়েছে।
কেশরহাট পৌরসভার বিশালপুর গ্রামের পাটচাষি মো. সুজন ইসলাম বলেন, গত বছর পাটের ভালো দাম না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ছিল। তবে এবার ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি বাজারদরও ভালো রয়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৬০০ টাকার বেশি দরে বিক্রি করতে পারছি। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও এবার ভালো লাভ হবে বলে আশা করছি।
ধুরইল ইউনিয়নের মহব্বতপুর গ্রামের কৃষক জয়নাল আলম বলেন, ‘আমি দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় এবার পাট জাগ দেওয়া ও ধোয়ার কাজে তেমন সমস্যা হয়নি। পাশাপাশি বাজারদরও ভালো রয়েছে। এতে আমরা কৃষকরা খুশি।’
মোহনপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৭০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে ২০১ দশমিক ২৫ টন পাট উৎপাদন হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো বাজারদরের কারণে কৃষকরা পাট চাষে আগ্রহী হয়েছেন। বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে আগামী বছর মোহনপুরে পাটের আবাদ আরও বাড়তে পারে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলার নয়টি উপজেলায় কমবেশি পাটের আবাদ হয়েছে। মোট ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৪৯ হাজার টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ইতোমধ্যে জেলার প্রায় ৮২ শতাংশ জমির পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ শেষ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ৪৮ হাজার ২০০ টন পাট পাওয়া গেছে। বাকি জমির পাট সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শেষ হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
গত বছর রাজশাহীতে ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। ওই বছর উৎপাদন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৬৭৭ টন। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে এবং উৎপাদনও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজশাহীর বিভিন্ন হাট-বাজারে বর্তমানে প্রতি মণ পাট ৩৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মান ও বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী কোথাও কোথাও প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে সন্তোষজনক দাম পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উৎসাহ বেড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মিতা সরকার বলেন, সরকারি প্রণোদনা, সময়মতো উন্নতমানের বীজ ও সার সরবরাহ এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার রাজশাহীতে পাটের আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে। প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা দরে হিসাব করলে চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার পাট বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক নাদিম আক্তার বলেন, চলতি বছর জেলায় প্রায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল পাট উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন প্রায় ২১ হাজার কুইন্টাল বেশি হতে পারে। বর্তমানে কোনো কোনো এলাকায় প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে।
মোহনপুরের কৃষকরা বলছেন, পাটের বর্তমান বাজারদর ধরে রাখা গেলে আগামী মৌসুমে আবাদ আরও বাড়বে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে পাট চাষ আরও লাভজনক হয়ে উঠবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পাটের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে মোহনপুরের কৃষকদের আয় বাড়বে। একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ‘সোনালি আঁশ’ পাটের অবদান আরও শক্তিশালী হবে।



