
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কলাভবনে তীব্র শ্রেণিকক্ষ সংকটে ভুগছেন শিক্ষার্থীরা। পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় উর্দু ও পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগের মতো কয়েকটি বিভাগে একই কক্ষে একাধিক বর্ষের ক্লাস নিতে হচ্ছে। কোথাও গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হচ্ছে, আবার কোথাও শ্রেণিকক্ষের বাইরে বসে ক্লাস করারও অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের।
শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে কখনো ক্লাসের সময় পরিবর্তন, কখনো অন্য বিভাগের সঙ্গে কক্ষ ভাগ করে ক্লাস এবং কখনো ক্লাস বাতিল হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ সংকট চললেও এর স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, কলা অনুষদের সব বিভাগ এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের কয়েকটি বিভাগের একাডেমিক কার্যক্রম কলাভবনে পরিচালিত হয়। কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটে প্রতিবছর প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষে প্রায় ২ হাজার ৯৩৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এর মধ্যে কলাভবনের ১৭টি বিভাগে প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার ৮৯৬ জন শিক্ষার্থী ক্লাস করেন।
কলাভবনের ১৭টি বিভাগের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ বিভাগের মাত্র দুটি করে স্থায়ী শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। ভবনটির মোট ৫৭টি কক্ষের মধ্যে ১৭টি বিভাগের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৪২টি। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের তিনটি বিভাগের শ্রেণিকক্ষগুলো তালাবদ্ধ থাকে। বাকি কক্ষগুলো কলা অনুষদের ডিনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব কক্ষ বিভিন্ন বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী যৌথভাবে ক্লাস নেওয়ার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বর্তমানে কলাভবনের ১৭টি বিভাগের মধ্যে উর্দু ও পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগে মাত্র একটি করে স্থায়ী শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। বাংলা, আরবি, ফারসি, সংস্কৃত, ইতিহাস, ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা, ভাষাবিজ্ঞান, বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি, দর্শন ও নৃত্যকলা বিভাগের দুটি করে স্থায়ী শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। ইংরেজি বিভাগের চারটি এবং সংগীত ও থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের পাঁচটি করে স্থায়ী শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। সব মিলিয়ে স্থায়ী শ্রেণিকক্ষের সংখ্যা ৪২টি।
এক কক্ষেই পাঁচ বর্ষের ক্লাস
পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগের স্থায়ী শ্রেণিকক্ষ একটি—৬০১৮ নম্বর কক্ষ। প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত বিভাগের মোট প্রায় ৩১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য এই একটি কক্ষই স্থায়ীভাবে বরাদ্দ। প্রতি বর্ষে ৬৫ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী থাকায় একই কক্ষে গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হয়।
কক্ষ সংকটের কারণে অনেক সময় ৬০৬০ ও ৬০৭১ নম্বর যৌথ কক্ষেও অন্য বিভাগের সঙ্গে ভাগ করে ক্লাস করতে হয়। এতে প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
একই পরিস্থিতি উর্দু বিভাগেরও। বিভাগের স্থায়ী শ্রেণিকক্ষ একটি—৩০৫৫ নম্বর কক্ষ। প্রথম বর্ষ থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য এই একটি কক্ষই স্থায়ীভাবে বরাদ্দ রয়েছে। প্রতি বর্ষে ৫৫ থেকে ৭০ জন শিক্ষার্থী থাকায় একই কক্ষে গাদাগাদি করে ক্লাস করতে হয়।
কক্ষ সংকটের কারণে
উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থীদের ৩০৭১, ৩০৫৬, ২০৬৫, ২০৬৬, ৪০১৭ ও ৫০৫৫ নম্বর কক্ষেও ক্লাস করতে হয়। এতে ক্লাসের সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে সকাল, দুপুর ও বিকেলে ক্লাস করতে হয় শিক্ষার্থীদের।
উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিগত শাসনামলে উর্দু বিভাগকে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। কলাভবনের এতগুলো রুমের মধ্যে আমাদের মাত্র একটি স্থায়ী রুম (৩০৫৫), যা দেখে মনে হয় আদিম যুগের। সাউন্ড সিস্টেম কাজ করে না বললেই চলে, শিক্ষার্থীদের বসার সমস্যা। বর্তমান ব্যাচগুলো অন্যান্য বিভাগের ক্লাসরুমে ক্লাস করে। তাছাড়া ক্লাসরুম খুঁজতে গিয়ে হয়রানি হতে হয়। ক্লাসরুম সংকটের কারণে ক্লাস ক্যানসেল হয়ে যায়। অনেক সময় ক্লাস খুঁজতে দেরি হলে ক্লাস হয় মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট।’
তিনি আরও বলেন, ‘নানা জটিলতার মধ্য দিয়ে বিভাগ এগুলো পার করে আসছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এর সুরাহা করতে পারছে না। আমরা উন্নত শিক্ষা পদ্ধতি থেকে বঞ্চিত এবং আদিমকালেই পড়ে থাকছি। আমরা এর যৌক্তিক সমাধান চাই এবং অন্যান্য বিভাগের মতো আমাদের আরও ক্লাসরুম বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সুনজর কামনা করছি।’
সময়সূচি নিয়েও ভোগান্তি
বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আকাশ বলেন, ‘রুমের সংকট এতটাই যে, এক ব্যাচের ক্লাস থাকলে অন্য ব্যাচ ক্লাস করতে পারে না। ফলে সকাল-বিকেল মিলিয়ে সপ্তাহে পাঁচ দিনই (রোববার-বৃহস্পতিবার) আমাদের ক্লাস করতে হয়। অনেক সময় মাঝখানে লম্বা গ্যাপ দিয়ে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ক্লাস থাকে।’
তিনি বলেন, ‘ক্লাসরুম সংকট না থাকলে দিনে একাধিক ক্লাস নিয়ে তিন-চার দিনেই সব ক্লাস শেষ করা যেত। রুম না পাওয়ার কারণে কোনো ক্লাস বাতিল হলে সেটি আবার অন্য দিন নিতে হয়। এতে শিক্ষার্থীদের প্রচুর সময় নষ্ট হয়।’
ক্লাসরুম সংকট নিয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বিপ্লব বলেন, ‘কথায় আছে, উপরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট। এই কথাটির সবচেয়ে বিশ্বস্ত বাস্তব উদাহরণ হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন। প্রয়োজনীয় ক্লাসরুম নেই, এ কথা বলাও যেন বিলাসিতা। যেটুকু আছে, সেগুলোও আবার ধারণক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার বিভাগে মোটে দুটো ক্লাসরুম। একটিতে প্রতি বেঞ্চে পাঁচজন করে বসলে বসা যায়। আরেকটাতে তো বসা নয়, প্রবেশ করাটাই সৌভাগ্যের ব্যাপার। ফলাফল? ক্লাস চলাকালীন শিক্ষার্থীদের একাংশ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ ক্লাস করে ভেতরে, কেউ করে করিডোরে। এক প্রকার ওপেন এয়ার এডুকেশন সিস্টেম। দুটো ক্লাসরুম দিয়েই পাঁচটি ব্যাচের ক্লাস নেওয়া হয়।’
আশিকুর রহমান আরও বলেন, ‘কখনো লেকচার থিয়েটারে দৌড়াদৌড়ি, কখনো ডিনস অফিসের কোনো রুমে ক্লাস। জ্ঞান এখানে স্থির নয়, জ্ঞান যাযাবর। আজ এই ঘরে, কাল অন্য ঘরে। মনে হয় এগুলো ক্লাস নয়, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন কার্যক্রম। এভাবেই দিনের পর দিন চলছে। বসার জায়গা যেখানে নেই, সেখানে পড়াশোনা স্বপ্ন নয়, একটি উচ্চাভিলাষী বিলাসিতা।’
প্রশাসন যা বলছে
শ্রেণিকক্ষ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকার বলেন, প্রায় সব বিভাগের নামেই নির্দিষ্ট শ্রেণিকক্ষ দেওয়া আছে। বাকি কক্ষগুলোর জন্য ডিন অফিস থেকে বিভিন্ন স্লট দেওয়া হয়।
তবে সংকটের মূল কারণ হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস নেওয়ার প্রবণতাকে উল্লেখ করেন তিনি। ডিন বলেন, ‘সাধারণত সবাই ১০টা, ১১টায় একই সময়ে ক্লাস নিতে চায়, যে কারণে এই সংকট তৈরি হয়। সকাল ৮টায় এবং দুপুরের পরে প্রায় রুমগুলোই ফাঁকা থাকে। সবাই যদি একই সময়ে ক্লাস না নিয়ে সময়গুলো সমন্বয় করেন, তাহলে সংকট অনেকটা কেটে যাবে।’
তিনি আরও বলেন, পপুলেশন সায়েন্স, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজের মতো সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয় এবং সাইকোলজি ও ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির মতো জীববিজ্ঞান অনুষদের বিষয়গুলোর ক্লাস এখনও কলাভবনে হচ্ছে। এসব বিভাগ নতুন ভবনে চলে গেলে কলা অনুষদের শ্রেণিকক্ষ সংকট অনেকটা দূর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী অবকাঠামো না বাড়াই এ সংকটের মূল কারণ।
তিনি বলেন, ‘স্পেস অ্যালোকেশন কমিটিকে আমরা দায়িত্ব দিয়েছি। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অনেক বিভাগ নতুন ভবনে যাওয়ায় যেসব কক্ষ ফাঁকা হয়েছে এবং যেসব বিভাগের ক্লাসরুম ব্যবহৃত হয় না, সেগুলো সমন্বয় করে অন্য বিভাগগুলোকে ক্লাস নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।’


