
আইনগত জটিলতার অবসান, পিএসসির সঙ্গে কাজ শুরু: প্রতিমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদন: দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর দীর্ঘদিনের প্রধান শিক্ষক সংকট কাটতে যাচ্ছে। আইনগত জটিলতার অবসান হওয়ায় ৩২ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম শিগগিরই শুরু হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এ নিয়োগের বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকেলে রাজশাহী বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই) মিলনায়তনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। এর আগে একই স্থানে ‘বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা, মনিটরিং, জবাবদিহিতা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সংস্কার’ শীর্ষক দিনব্যাপী কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তিনি।
প্রধান শিক্ষক নিয়োগে কাটল জটিলতা
ববি হাজ্জাজ বলেন, দীর্ঘদিন আইনগত জটিলতার কারণে ৩২ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন সেই জটিলতা নেই। পিএসসির সঙ্গে কাজ শুরু হয়েছে। খুব শিগগিরই নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এতে শিক্ষকদের বেতন-স্কেলসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে কারিকুলাম, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, বাথরুম ও খেলার মাঠের মান উন্নয়নেও নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
নিবন্ধনের আওতায় আসবে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়
সরকারি-বেসরকারি সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে মনিটরিংয়ের আওতায় আনার কথা জানিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে। সেই মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে বিদ্যালয়ের নিবন্ধন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। নিবন্ধন ছাড়া কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ফি আদায়ের বিষয়েও কঠোর হওয়ার ইঙ্গিত দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সেবার বিনিময়ে বেতন নেওয়ার সুযোগ থাকলেও অন্যায়ভাবে অভিভাবকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণিতে তৃতীয় ভাষার পরিকল্পনা
প্রাথমিক শিক্ষায় সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, গান ও নৃত্যের পাশাপাশি বক্তৃতা, বিতর্ক, কেরাতসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সাংস্কৃতিক শিক্ষার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ কাজে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নেওয়ার পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দক্ষ শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানো হবে।
নির্দিষ্ট বিষয়ে একাধিক বিদ্যালয়ে পাঠদানের জন্য অস্থায়ী শিক্ষক ব্যবস্থার নীতিমালাও করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া প্রাথমিকের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে তৃতীয় ভাষা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তার আগে শিক্ষার্থীদের ফাউন্ডেশন লার্নিংয়ের মান উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
‘শিক্ষিত নয়, মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক করতে হবে’
প্রাথমিক শিক্ষাকে শুধু পাঠ্যপুস্তকনির্ভর না রেখে ‘অ্যাকটিভ লার্নিং’ পদ্ধতিতে নেওয়ার কথা জানিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘আগামী প্রজন্মকে শুধু শিক্ষিত নয়, সিভিক ও ভ্যালু-ভিত্তিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি না কম—এটি মূল বিষয় নয়। প্রতিটি শিশু সঠিক শিক্ষা পাচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। জন্মহার কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে সব এলাকায় সমানসংখ্যক শিক্ষার্থীর চাহিদা থাকবে না।
তিনি বলেন, কোনো অভিভাবককে জোর করে সরকারি বিদ্যালয়ে সন্তান ভর্তি করানো হবে না। বিদ্যালয়ের মান এমন পর্যায়ে নেওয়া হবে, যাতে অভিভাবকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সন্তানকে সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে চান।
কোনো শিশু যেন বিদ্যালয়ের বাইরে না থাকে, সে জন্য স্কুল ফিডিং, ইউনিফর্ম, জুতা ও ব্যাগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
মাঠপর্যায়ের মতামত নিয়ে সংস্কার পরিকল্পনা
কর্মশালায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। দেশের আট বিভাগে ধারাবাহিকভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজশাহীর পর খুলনা, রংপুর ও ঢাকা বিভাগে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, কর্মশালার মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নতুন নীতিগত উদ্যোগ সম্পর্কে অবহিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত নেওয়া হচ্ছে। সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার পাশাপাশি পরবর্তী ১৮০ দিন এবং পাঁচ বছরের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সদস্যরা কাজ করবেন।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলীর সভাপতিত্বে কর্মশালায় বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (আইএমডি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম ও রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আব্দুস সালাম।


