
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার শীর্ষ মাদক কারবারি জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেপ্তারে তৎপর হয়েছে পুলিশ। তাকে ধরতে ইতোমধ্যে তার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে পুলিশের অভিযানের আগেই তিনি পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। তাকে যেকোনো মূল্যে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহাম্মদ শাহজাহান।
‘মাদকমুক্ত থানা গড়ার লক্ষ্যে’ গত ৩০ জুন ২০২৬ মঙ্গলবার গোদাগাড়ী উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে মতবিনিময় সভা ও কমিউনিটি পুলিশিং সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় হেরোইন ও ইয়াবা মাফিয়া হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলম মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যদের নিয়ে হাজির হন। এ ঘটনায় অনেকেই অস্বস্তিতে পড়েন। সভায় একজন বক্তা মাদক কারবারিদের উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরেন।

এ নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় ব্যাপক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এলাকায় তোলপাড় শুরু হয়। ‘মাদক নির্মূল সভায় কারবারি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। শুক্রবার রাতে গোদাগাড়ী পৌরসভার মাদারপুর মহল্লায় তার বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। গোদাগাড়ী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মির্জা মো. আব্দুস ছালাম নিজে অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, অভিযানের আগেই জাহাঙ্গীর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। বাড়িতে ব্যাপক তল্লাশি চালানো হয়, কিন্তু কোনো অবৈধ মাদকদ্রব্য বা সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া যায়নি। এ ঘটনার পর তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগও খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। তার বক্তব্য জানতে মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, “জাহাঙ্গীর আলম থানার তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। ডিআইজি স্যারের নির্দেশে সার্কেল এএসপির নেতৃত্বে তার বাড়িতে অভিযান চালানো হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।”
জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকাশ্যে আসেন। এলাকায় প্রচার রয়েছে, তিনি অথবা তার বাবা নওশাদ আলী গোদাগাড়ী পৌরসভার মেয়র পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে আসার পর তিনি মাদক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। মাদক ব্যবসায়ীরা এখন তাকেই টাকা দিয়ে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের তুষ্ট রাখেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
জাহাঙ্গীরের বাবা নওশাদ আলী ওরফে নওশাদ জামাতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। তিনি গোদাগাড়ী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং বর্তমানে ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। জাহাঙ্গীরের ভাই আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধেও মাদকের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তিনি সরাসরি মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে স্থানীয়রা জানান। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে এবং তিনজনে মিলে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন বলে অভিযোগ।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে গোদাগাড়ী থানায় ২০০৮, ২০১০ ও ২০১৪ সালে তিনটি মাদক মামলা এবং একটি অস্ত্র মামলা রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ২০১৫ সালে এবং যশোরের কোতোয়ালী থানায় ২০২০ সালে একটি করে মাদক মামলা রয়েছে। এসব মামলায় হেরোইন, ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা উল্লেখ রয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক এমপি ওমর ফারুক চৌধুরীর ছত্রছায়ায় থেকে হেরোইন ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন জাহাঙ্গীর। বারবার গ্রেপ্তার হলেও অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বেরিয়ে আসতেন তিনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওমর ফারুক চৌধুরী তার বাড়িতে দলবল নিয়ে দাওয়াত খেয়েছেন।
জাহাঙ্গীরের সম্পদের তালিকা বিস্ময়কর। মাদারপুরে প্রায় দুই বিঘা জমির ওপর প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। মাদক ব্যবসা আড়াল করতে চার কোটি টাকায় গরু-মহিষের খামার গড়েছেন। তার ছয়টি ট্রাক রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য চার কোটি টাকা। রাজশাহী শহরে ফ্ল্যাট, শিরোইল কলোনিতে সাড়ে সাত কাঠা জমিসহ টিনশেড বাড়ি, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রান্তিক আবাসিক এলাকায় ছয় কাঠা প্লট এবং তিনটি গাড়ি রয়েছে তার। এছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় তার অঢেল সম্পদ রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিএনপির এক নেতা ও গোদাগাড়ী পৌরসভার মেয়র প্রার্থী বলেন, “জাহাঙ্গীর ও তার বাবা মাদক সম্রাট। মাদক ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন। পুলিশ অভিযানের আগাম খবর পেয়ে প্রাইভেট কারে ঢাকায় আত্মগোপন করেছেন।”
মাদক নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের এই তৎপরতাকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তবে জাহাঙ্গীরের মতো প্রভাবশালী মাদক কারবারিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও তার সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।


