
স্টাফ রিপোর্টার: রাকিবুল ইসলাম
ঐতিহ্যবাহী কেশরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে একটি মহল আদিবাসী শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি দীর্ঘ ১০৬ বছর ধরে মোহনপুর উপজেলার শিক্ষাক্ষেত্রে অন্যতম সুপরিচিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুনাম অর্জন করে আসছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়টি বিতর্কের মুখে পড়ে। ভিডিওতে অভিযোগ করা হয় যে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিশুদের ভর্তি নেয় না। তবে উপজেলা প্রশাসনের অনুসন্ধানে অভিযোগের পেছনে ভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।

গত ৮ জুলাই ২০২৬ বুধবার মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহিমা বিনতে আখতার আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। কেশরহাট পৌর এলাকার রায়ঘাটি গ্রামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি তার হাফিজিয়া মাদ্রাসায় পড়ুয়া সন্তানকে বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি করাতে আসেন। ভর্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শিক্ষক-শিক্ষিকারা শিশুটির বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে প্রাথমিক দক্ষতা যাচাই করেন। শিশুটি সন্তোষজনকভাবে পড়তে না পারায় শিক্ষকরা তাকে প্রায় দুই মাস নিয়মিত ক্লাস করে ভর্তির উপযোগী হয়ে ভর্তি নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু অভিভাবক তাৎক্ষণিক ভর্তির জন্য অনড় অবস্থান নেন।
অভিযোগ রয়েছে, ভর্তি না হওয়ায় ওই ব্যক্তি রায়ঘাটি গ্রামের কয়েকজন আদিবাসী নারীকে ডেকে সাংবাদিকের সামনে বক্তব্য দিতে উদ্বুদ্ধ করেন। পরে সেই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভাইরাল হয়। তদন্তে দেখা যায়, ভিডিওতে বক্তব্য দেওয়া তিন নারী—চম্পা (২৮), জোসনা (৩৭) ও রূপালি (২৬)—চলতি বছরে নিজেদের সন্তানকে কেশরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে যাননি।
চম্পা জানান, তিনি তিন বছর বাগমারা উপজেলায় বাবার বাড়িতে ছিলেন এবং মাত্র তিন মাস আগে ফিরেছেন। এলাকায় শুনেছেন আদিবাসী শিশুদের ভর্তিতে সমস্যা হয়, সেই কথা ভিত্তিতে ক্যামেরার সামনে কথা বলেছেন। জোসনার নিজের ভর্তি-উপযোগী সন্তান নেই, তবে বোনের সন্তানের ভর্তির কথা শুনে অভিযোগ করেছেন। রূপালি বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসে লোকমুখে শুনে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনজনই স্বীকার করেছেন যে, তারা নিজেরা সরাসরি ভর্তির চেষ্টা করেননি। এলাকার কয়েকজন মুসলিম ব্যক্তি তাদের কাছে এসে আদিবাসী শিশুদের ভর্তির বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দা মামুন অর রশিদ বলেন, “কেশরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতীতেও অনেক আদিবাসী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছে এবং বর্তমানেও অনেকে অধ্যয়নরত। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাদের সহযোগিতা করে থাকি। একটি বিভ্রান্তিকর ঘটনায় বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মুরশিদা খাতুন জানান, “আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ভর্তি না নেওয়ার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সব শিশুকেই সমান সুযোগ দেওয়া হয়। বর্তমানে তৃতীয় শ্রেণিতে দুইজন এবং প্রাক-প্রাথমিকে দুইজন আদিবাসী শিক্ষার্থী পড়ছে। ভবিষ্যতেও যেকোনো শিশু নিয়ম মেনে ভর্তি হতে চাইলে তাকে ভর্তি করা হবে।”
ইউএনও ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, “প্রধান শিক্ষিকা আমাকে ভর্তির রেজিস্টার দেখিয়েছেন। ইতিমধ্যে চারজন আদিবাসী শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে ভর্তি রয়েছে। আদিবাসী পাড়ায় গিয়ে যারা ভর্তি হতে পারেনি বলে অভিযোগ করেছেন, তাদের তালিকা চেয়েছি। এখনও কোনো তালিকা পাইনি। তালিকা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়রা মনে করেন, ভাইরাল ভিডিওটি বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপপ্রচার এড়াতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে আরও সুস্থ যোগাযোগ ও পারস্পরিক আস্থা বাড়ানো জরুরি।
এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য যাচাই-বাছাই না করে প্রচার করলে সুনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি অপপ্রচার রোধে প্রশাসনের সতর্কতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেশরহাট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের নজর রাখা উচিত।


