
মণপ্রতি ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম, লাভের মুখ দেখছেন কৃষক; আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর
একসময় ন্যায্যমূল্যের অভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও পাটকল বন্ধের ধাক্কায় হারিয়ে যেতে বসেছিল ‘সোনালি আঁশ’ পাটের গৌরব। তবে বদলাতে শুরু করেছে সেই চিত্র। বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহার এবং চলতি মৌসুমে আকর্ষণীয় বাজারদর—সব মিলিয়ে রাজশাহীতে আবারও বাড়ছে পাট চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ। মৌসুমের শুরুতেই প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়ায় কৃষকের মুখে ফিরেছে হাসি।

রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, আগাম জাতের পাট কাটার কাজ প্রায় শেষ। কোথাও চলছে জাগ দেওয়া, কোথাও আঁশ ছাড়ানো ও শুকানোর কাজ। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে বাজারে পাট বিক্রি শুরু করেছেন। অন্যদিকে যেসব জমিতে পাট এখনও পরিপক্ব হয়নি, সেখানে চলছে কাটার প্রস্তুতি। পাট কাটার পর দ্রুত আমন ধান রোপণের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন কৃষকেরা।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে পবা উপজেলার নওহাটা হাটে গিয়ে দেখা যায়, নতুন পাটের বেচাকেনা শুরু হয়েছে। মানভেদে প্রতি মণ নতুন পাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। বাজারে আগাম পাটের সরবরাহ বাড়লেও দাম নিয়ে সন্তুষ্ট কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
পাট ব্যবসায়ী উজ্জ্বল হোসেন কালবেলাকে জানান, গত বছর মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় কিনেছিলেন। এবার একই সময়ে কিনতে হচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকায়। গত বছরের তুলনায় বাজারদর অনেকটাই ভালো।
পবা উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামের কৃষক বাবলু আহমেদ জানান, পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম জাতের পাট চাষ করেছেন তিনি। প্রতি বিঘায় প্রায় ১২ মণ ফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে ১২ মণ পাট সাড়ে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি করে সব খরচ বাদে প্রতি বিঘায় প্রায় ২৫ হাজার টাকা লাভ করেছেন।
একই উপজেলার বড়গাছী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল আলীম বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট চাষে প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় প্রতি বিঘায় ১০ থেকে ১২ মণ ফলন হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও প্রতি বিঘায় প্রায় ২০ হাজার টাকা লাভের সুযোগ রয়েছে। তবে মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে।
হরিপুর গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, ফলন ভালো হলেও শ্রমিক সংকট এবং পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির অভাবে অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে। এসব সমস্যা দূর হলে কৃষকের লাভ আরও বাড়বে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর ছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টর। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ১ হাজার ৯৪ হেক্টর।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন কালবেলাকে জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৯ হাজার ৩৩৩ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৬৫৬ মেট্রিক টন বেশি। সময়মতো বৃষ্টিপাত ও কৃষকদের নিবিড় পরিচর্যায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে। বাজারে বর্তমান দাম অব্যাহত থাকলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এম এ মান্নান বলেন, মৌসুমজুড়ে বর্তমান বাজারদর স্থিতিশীল থাকলে আগামী বছর আরও বেশি কৃষক পাট চাষে আগ্রহী হবেন।
অন্যদিকে পাট অধিদপ্তর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো. নাদিম আক্তার কালবেলাকে জানান, চলতি বছরে জেলায় সম্ভাব্য পাট উৎপাদন ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল, যা গত বছরের তুলনায় ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি। বর্তমানে প্রতি মণ পাট ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা দরে বিক্রি হওয়ায় আগাম চাষিরা ভালো লাভের আশা করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা এবং উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে ‘সোনালি আঁশ’ আবারও দেশের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।


