
মৌসুমের শুরুতে গাছে গাছে মুকুলের সমারোহ দেখে আশায় বুক বেঁধেছিলেন রাজশাহী অঞ্চলের আমচাষিরা। বাগানজুড়ে সোনালি মুকুল যেন বাম্পার ফলনেরই বার্তা দিচ্ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই আশা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। খরা, অনিয়মিত আবহাওয়া ও পোকার আক্রমণে রাজশাহী ও নওগাঁ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বাগানে ঝরে পড়েছে আমের গুটি। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে পাশের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। অনেক বাগানেই আমের উপস্থিতি সন্তোষজনক। যদিও বাজারদর নিয়ে উদ্বেগ রয়েই গেছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, রাজশাহীসহ চার জেলায় চলতি মৌসুমে আমের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৪৮৬ কোটি থেকে ৪ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। গড়ে প্রতি কেজি আমের দাম ৩২ থেকে ৪০ টাকা হিসেবে এই হিসাব করা হয়েছে।
এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে সাড়ে ৪ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে সম্ভাব্য বাণিজ্যের পরিমাণ ১ হাজার ৪৪০ কোটি থেকে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। নওগাঁয় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সম্ভাব্য বাজারমূল্য ১ হাজার ১২০ কোটি থেকে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এছাড়া নাটোরে ৫ হাজার ৬৯৩ হেক্টর বাগান থেকে ৬০ হাজার ৬৭৯ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে সম্ভাব্য বাণিজ্যের পরিমাণ ১৯৪ কোটি থেকে ২৪৩ কোটি টাকা। শুধু রাজশাহীতেই ৭৩২ থেকে ৮০০ কোটি টাকার আম বাণিজ্যের সম্ভাবনা রয়েছে।
একাধিক কৃষক জানান, গাছে এখনও মোটামুটি আম রয়েছে। তবে টানা বৃষ্টির কারণে পরিচর্যায় ব্যাঘাত ঘটছে। পোকামাকড় দমনে কীটনাশক প্রয়োগ করলেও বৃষ্টিতে তা ধুয়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ১৫ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে গুটি ও ন্যাংড়া আম বাজারে উঠতে পারে।
কৃষকদের অভিযোগ, বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ফরমালিন বিক্রি করছেন, যা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, এসব রাসায়নিকের কারণে রাজশাহীর আমের সুনাম ক্ষুণ্ন হতে পারে।
নওগাঁর আমচাষি হাফিজুর রহমান বলেন, “মৌসুমের শুরুতে যে পরিমাণ মুকুল এসেছিল, তাতে ভালো ফলনের আশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই হিসাব মিলছে না। বাজারে সঠিক তদারকি না থাকলে কৃষক ও বাগান মালিকরা বড় ধরনের লোকসানে পড়বেন।”
রাজশাহীর পবা উপজেলার চাষি শরিফুল ইসলাম বলেন, “খরার কারণে গাছে আম টিকিয়ে রাখা যায়নি। কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেব, বুঝতে পারছি না।”
বাগমারা উপজেলার আমচাষি শান্ত বলেন, “শুরুতে বাম্পার ফলনের আশা ছিল। এখন গাছে অর্ধেকেরও কম আম রয়েছে। প্রতিদিন আম ঝরে পড়ছে। সার, কীটনাশক ও সেচের খরচ বেড়েছে, কিন্তু ফলন কমে গেছে।”
মোহনপুরের আম ব্যবসায়ী উজ্জল হোসেন বলেন, “প্রতি মণ আম যদি দুই হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়, তাহলে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু অনেক সময় হাটে ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। এতে হতাশ হয়ে কেউ কেউ বাগান কেটে ফেলছেন।”
এদিকে আর কয়েক দিনের মধ্যেই রাজশাহী ও আশপাশের জেলাগুলোতে পাকা আম বাজারে আসতে শুরু করবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অপরিপক্ব আম সংগ্রহ ও বাজারজাত ঠেকাতে নজরদারি জোরদারের কথা বলা হয়েছে।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল বলেন, “এবার জেলায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১০ হেক্টর বেশি। আগামী ১০ মে বাজারজাতকরণ নিয়ে বৈঠক হবে। সেখানে আম পাড়ার ক্যালেন্ডার নির্ধারণ করা হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো ফলনের আশা করছি।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. মো. ইয়াছিন আলী বলেন, “জেলায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯ মেট্রিক টন। বর্তমানে বড় ধরনের গুটি ঝরার আশঙ্কা নেই। ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই আম পাড়া শুরু হতে পারে।”
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, “অপরিপক্ব আম যাতে আগেভাগে সংগ্রহ না করা হয়, সে জন্য নির্ধারিত সময়সূচি দেওয়া হবে। কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়েও আমরা কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন, আম সংরক্ষণের বিকল্প পদ্ধতি—যেমন আমসত্ত্ব, চিপস, জ্যাম ও জেলি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের প্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে, যাতে বাজারদর কমলেও তারা বিকল্প উপায়ে লাভবান হতে পারেন।
গত কয়েক বছর ধরেই একের পর এক সংকটে পড়ছেন এ অঞ্চলের আমচাষিরা। করোনার প্রভাব কাটার আগেই খরা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘ ঈদ ছুটিতে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতা—সব মিলিয়ে লোকসানের চক্র থেকে বের হতে পারছেন না তারা। এবারও শেষ পর্যন্ত বাজারদরই নির্ধারণ করবে, রাজশাহীর আমচাষিদের মুখে হাসি ফুটবে, নাকি হতাশাই আরও বাড়বে।


