
আমরা অনেক সময় এমন কিছু মানুষকে দেখি, যারা কোনো নিরীহ পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই তীব্র রেগে যান। মুখে ঘাম, চোখ লাল, গলা চড়িয়ে অস্পষ্ট বা সহিংস ভাষায় কথা বলেন। এমন বিস্ফোরক রাগের পর আবার কিছুক্ষণ পর স্বাভাবিক হয়ে যান, অনুশোচনা করেন, কিন্তু পরবর্তীতে আবার একই আচরণে ফিরে যান। অনেকেই এ রকম আচরণকে ব্যক্তিত্বের অংশ বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, এই আচরণ হতে পারে একটি মানসিক রোগের লক্ষণ, যার নাম ‘ইন্টারমিটেন্ট এক্সপ্লোসিভ ডিসঅর্ডার’ বা সংক্ষেপে IED।

এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত পুরো সময় স্বাভাবিক থাকেন, কিন্তু হঠাৎ করে সামান্য উত্তেজনাতেই রাগে বিস্ফোরিত হয়ে ওঠেন। বিষয়টি তখন আর সাধারণ রাগ নয়, বরং পরিস্থিতির তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রাগের বিস্ফোরণ এক প্রকার অপ্রয়োজনীয়, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া, যা ব্যক্তি নিজেও বুঝে উঠতে পারেন না। লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির মনোরোগবিদ্যা বিভাগের প্রধান ড. জোসেলিন আজার বলেন, এই রোগীরা রাগের সময় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান, কিন্তু রাগ কমে গেলে আবার একেবারে স্বাভাবিক আচরণে ফিরে যান। তাই অনেক সময় এ রোগ শনাক্ত করাই কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করা গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ মানুষ আজীবনের জন্য এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। বেশিরভাগ সময় মানুষ বিষয়টিকে মানসিক সমস্যা হিসেবে দেখেন না, বরং স্বভাবগত রাগ বা মেজাজ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অথচ বাস্তবতা হলো, এই রোগ সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্ক এমনকি আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।
IED-এর সময় রোগীর শরীরে ও মস্তিষ্কে নানা পরিবর্তন ঘটে। মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা নামক অংশ, যা আবেগ ও ভয় নিয়ন্ত্রণ করে, তা এই রোগীদের ক্ষেত্রে অতিসক্রিয় হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে সেরোটোনিন নামক হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা যায়, যা আবেগনিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর ফলে মস্তিষ্ক এমন এক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে যা একেবারে হঠাৎ করে মানুষকে চিৎকার, গালিগালাজ, ভাঙচুর বা শারীরিক সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়।
এই রোগের মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা জৈবিক, পরিবেশগত ও পারিবারিক প্রভাবকে দায়ী করছেন। বিশেষ করে শৈশবে যেসব শিশু ঘন ঘন মানসিক চাপ, শারীরিক নির্যাতন, বুলিং বা পারিবারিক অস্থিরতার মধ্যে বেড়ে ওঠে, তাদের মধ্যে এই ব্যাধি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এমনকি মাদক ও অ্যালকোহলের ব্যবহারও এই রোগকে জটিল করে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, শরীর কাঁপে, বুকে টানটান ভাব অনুভব হয় এবং তারা শারীরিকভাবে ক্লান্ত বোধ করেন।
IED-এর নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ রয়েছে। যেমন— হঠাৎ চিৎকার করা, ক্ষিপ্ত হয়ে চড় থাপ্পড় দেওয়া, জিনিসপত্র ভাঙচুর করা বা কাউকে শারীরিকভাবে আঘাত করা। এমনকি এসব আচরণের পরে অনেকে অপরাধবোধে ভোগেন, অনুশোচনা করেন, কিন্তু ফের সেই একই আচরণে ফিরে যান। এই রোগের তীব্রতা যদি ৩ মাসে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার কিংবা বছরে তিনবার বড় রকমের রাগের বিস্ফোরণ হিসেবে দেখা যায়, তাহলে বিষয়টিকে চিকিৎসাজনিত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
রোগের চিকিৎসা হিসেবে বর্তমানে বিভিন্ন থেরাপি ও ওষুধের ব্যবহার চলছে। কগনিটিভ বিহেভিয়োরাল থেরাপি (CBT), রিলাক্সেশন ও ব্রিদিং টেকনিকস এবং রাগ নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ কার্যকর ভূমিকা রাখে। তবে কিছু ক্ষেত্রে মেজাজ স্থিতিশীল রাখতে ও সেরোটোনিন নিয়ন্ত্রণে রাখতে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধও দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক রোগী ওষুধ গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেন এবং থেরাপি বেছে নেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে পেশাদার চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা গ্রহণ জরুরি।
IED শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এর প্রভাব পরিবার, বন্ধু এবং কর্মক্ষেত্রেও পড়ে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ অনেক বেশি থাকে। ফলে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সদস্যদের উচিত রোগীকে দোষারোপ না করে, শান্তভাবে তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া।
এই রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। আমরা প্রায়ই বলি, ‘সে খুব রাগী’, ‘ওর মেজাজ খারাপ’, কিন্তু এই শব্দগুলোর আড়ালে হয়তো একটা নিরীহ চেহারার মানসিক রোগ লুকিয়ে আছে। আর সেই রোগ সঠিকভাবে চিহ্নিত করে চিকিৎসা না করালে, তা ধীরে ধীরে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে—ব্যক্তিগত সম্পর্ক ধ্বংস করতে পারে, আইনত জটিলতা তৈরি করতে পারে, এমনকি শারীরিক রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, আমাদের মনে রাখতে হবে, রাগ মানুষের স্বাভাবিক আবেগ হলেও, বারবার এবং অতিরিক্ত রাগের বহিঃপ্রকাশ কখনোই স্বাভাবিক নয়। তাই এ ধরনের উপসর্গ দেখলে অবহেলা না করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করা জরুরি। কারণ মানসিক সুস্থতাই একটি পরিপূর্ণ জীবনের চাবিকাঠি।


