
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী জেলায় প্রার্থীদের জয়–পরাজয় নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছেন নারী ভোটাররা। মোট ভোটারের অর্ধেকেরও বেশি নারী হওয়ায় নির্বাচনী সমীকরণে তাদের ভূমিকাই এখন মুখ্য। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলই নানা প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের মাধ্যমে নারী ভোটারদের নিজেদের পক্ষে টানতে মরিয়া। ফলে রাজনীতির মাঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন নারী ভোটার।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২২ লাখ ৬৩ হাজার ৯৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১১ লাখ ২৩ হাজার ৯০৪ জন, নারী ভোটার ১১ লাখ ৪০ হাজার ৩৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২৫ জন।

ভৌগোলিক বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ রাজশাহী জেলা বরেন্দ্র অঞ্চল, চরাঞ্চল ও জলাশয়ঘেরা জনপদ নিয়ে গঠিত। জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষি পেশার সঙ্গে যুক্ত। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে কাজ করেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরা শ্রমে এগিয়ে থাকলেও যাতায়াত পথে হয়রানি, মজুরি বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তাদের নিত্যসঙ্গী। আসন্ন নির্বাচনে এসব সমস্যা থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতিই খুঁজছেন তারা।
‘ইসলামিয়া কলেজ রাজশাহী’ এর ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাবরিনা শারমিন বনি বলেন, ❝শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু অবকাঠামো নয়, দক্ষ শিক্ষক, গবেষণাভিত্তিক পাঠদান ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষাকে রাজনীতি ও বৈষম্যের ঊর্ধ্বে রেখে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।❞ তিনি আরো বলেন, জামায়াত নারীদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার কথা বলছে। রাজশাহীর নারী ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়াও পাচ্ছে তারা।
পবা উপজেলার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের নারী ভোটার সাগরা বেগম বলেন, ❝আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন কৃষিকাজ হচ্ছে। আমরা কারিগরি প্রশিক্ষণ চাই, যাতে কাজের দক্ষতা বাড়ে এবং আয়ও বাড়ে❞।
বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির সংকট নিরসন, দোরগোড়ায় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীদেরও। তাদের মতে, এসব মৌলিক চাহিদা পূরণ না হলে নারীর উন্নয়ন কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
শুধু গ্রামাঞ্চল নয়, শহরের নারী উদ্যোক্তারাও নারীবান্ধব নীতি ও সহায়তা প্রত্যাশা করছেন। উদ্যোক্তা অন্তরা বেগম বলেন, নতুন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নিরাপত্তা ও সহযোগিতার পরিবেশ দরকার। সরকার পাশে থাকলে আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারব।
নারী ব্যবসায়ী শাপলা বেগম বলেন, শুধু সাধারণ নারীরাই নয়, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারীরাও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। সরকারিভাবে সুযোগ-সুবিধা তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে সমাজের সব স্তরের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
নারী উদ্যোক্তা খালেদা বানু বলেন, ❝নির্বাচিত সরকারের কাছে আশা করছি, তারা নারীদের জন্য আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবে। অনেক নারী ব্যবসা করতে চান, কিন্তু পুঁজির অভাবে পারেন না। শুধু নারীদের জন্য বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা প্রয়োজন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজের যথাযথ মূল্যায়নও জরুরি❞।
পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বরের ঝর্না বেগমসহ কয়েকজন নারী ভোটার জানান, ❝বাড়ি বাড়ি গিয়ে জামায়াতে ইসলামী নারী কর্মীরা কথা বলছেন। তারা নারীদের সমস্যা শুনছেন, সন্তানদের পড়াশোনা ও নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা করছেন। বিএনপির লোকজন তেমন আসে না। তাই জামায়াতের প্রচারই বেশি চোখে পড়ছে❞।
আরেক নারী ভোটার রোজিনা সুলতানা বলেন, ❝মহল্লায় জামায়াতের মেয়েরা নিয়মিত মিটিং করছে। তারা বোঝাচ্ছে ‘হ্যাঁ’তে কেন ভোট দেওয়া জরুরি। আগে বিএনপির প্রচার বেশি দেখতাম, এবার তেমন নেই❞।
অন্যদিকে বিএনপির নারী নেত্রী টুটটুকি বলেন, ❝আমরাও নারী ভোটারদের কাছে নিয়মিত মহল্লাভিত্তিক প্রচার চালাচ্ছি। নারী ভোটাররা ধানের শীষের প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছেন❞।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডা: নাজিব ওয়াদুদ বলেন, ❝রাজশাহীতে নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে জামায়াতে ইসলামী আলাদা সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করিয়েছে। ঘরোয়া পরিবেশে সভা, ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুকে সামনে রেখে তারা মাঠে আছে। বিপরীতে বিএনপির নারীভিত্তিক প্রচার তুলনামূলকভাবে দুর্বল❞।
নারী ভোটারের মন জয়ে দ্বারে দ্বারে ছুটছেন নেতারা
এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও নারীদের গুরুত্ব নিয়ে জোরালো বক্তব্য আসছে। বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা সভা-সমাবেশে বলছেন, সরকারে গেলে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক সহায়তা এবং মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিং সাপোর্ট দেওয়া হবে।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীরা বলছেন, তারা এমন দেশ চান যেখানে নারীরা ঘরে, কর্মস্থলে ও রাস্তায় নিরাপদ থাকবেন। তাদের ভাষ্য, নারীদের ওপর কোনো পোশাক বা আচরণ চাপিয়ে দেওয়া হবে না; বরং সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে নারীরা উন্নয়নে ভূমিকা রাখবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার আসে সরকার যায়, কিন্তু নারীদের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয় না। নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি নয়, নির্বাচনের পর বাস্তবায়নই নারীদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা ছাড়া নারীর উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনে নারী ভোটার শুধু সংখ্যা নয়, শক্তি। গ্রাম থেকে শহর, কৃষিশ্রমিক থেকে উদ্যোক্তা—সব শ্রেণির নারীই চাইছেন এমন প্রতিনিধি, যিনি বৈষম্য ছাড়াই নারীর উন্নয়নে কাজ করবেন এবং ভোটের পরেও পাশে থাকবেন। ফলে রাজশাহীতে এবারের নির্বাচনের বড় প্রশ্ন একটাই—নারী ভোটার কাকে ভরসা করেন।


