
সকাল সাড়ে ৮টা। মাকে ফোন করে হাসিনা খাতুন বলেছিলেন, ‘মা, আমার ওপর গজব চলছে।’ মায়ের সঙ্গে এটাই ছিল তাঁর শেষ কথা। এর প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর দুপুর ১২টার দিকে খবর আসে, শোয়ার ঘরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে হাসিনার মরদেহ।

সোমবার রাজশাহীর তানোর উপজেলার দমদমা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরিবারের অভিযোগ, স্বামীর যৌতুকের দাবিতে দীর্ঘদিনের নির্যাতনের শিকার ছিলেন হাসিনা। তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করছে পরিবার। তবে এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বেলা দেড়টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মর্গে হাসিনার মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে মরদেহ তাঁর বাবার বাড়ি তানোরের পিঁপড়া কালনা গ্রামে নেওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
ঘটনার পর থেকে হাসিনার স্বামী সাজু সরদার (৩৭) পলাতক রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে যৌতুকের জন্য নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে হাসিনার পরিবার।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে সাজুর সঙ্গে হাসিনার বিয়ে হয়। বিয়েতে দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৫০০ টাকা। এর মধ্যে পরিশোধ করা হয় মাত্র ৫০০ টাকা। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের জন্য হাসিনাকে বিভিন্ন সময় নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ পরিবারের। দুই বছরের দাম্পত্য জীবনে অন্তত সাতবার নির্যাতনের পর তাঁকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এসব ঘটনা নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিস-মীমাংসাও হয়েছে।
পরিবারের দাবি, যৌতুক হিসেবে হাসিনার বাবার কাছ থেকে নগদ লক্ষাধিক টাকা ও গরুও নেওয়া হয়েছিল। এরপরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি।
ঘটনাস্থলে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের ভাষ্য, হাসিনার মরদেহ ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝোলানো অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর পা মাটিতে ঠেকে ছিল এবং ঘরের দরজা খোলা ছিল। এ ছাড়া তাঁর মাথার চুল ভেজা ও কাদামাখা ছিল। শরীরেও আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে দাবি পরিবারের।
হাসিনার বাবা মতিউর রহমান বলেন, ‘সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আমার মেয়ে তাঁর মাকে ফোন করে বলে—মা, আমার ওপর গজব চলছে। এরপর দুপুর ১২টার দিকে আমরা খবর পাই, মেয়ের মরদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মামলা করার জন্য থানায় গিয়েছিলাম। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে হত্যার আলামত পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী মামলা হবে। পুলিশ মামলা না নিলে আমরা আদালতে হত্যা মামলা করব।’
তানোর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘সুরতহালের সময় মরদেহের শরীরে পুরোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। নতুন কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তারপরও আমরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইনি। মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে হত্যার বিষয়টি উঠে এলে থানায় মামলা হবে।’
হাসিনার মৃত্যুর ঘটনায় স্বামীর বিরুদ্ধে পরিবারের অভিযোগ এবং মরদেহের বিভিন্ন আলামত ঘিরে এলাকায় নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এখন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে পরিবার ও পুলিশ—যা নির্ধারণ করবে হাসিনার মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে।


