
প্রতিটি শিশুর সামগ্রিক ও সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে একক কোনো উদ্যোগ নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ (ইসিডি) খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অগ্রগতি হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে এখনও গতি আসেনি।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাজশাহী নগরীর হোটেল এক্সে ‘ক্যাটালাইজিং হোল চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ: দ্য ওয়ে ফরোয়ার্ড’ শীর্ষক আঞ্চলিক প্রচার ও মতবিনিময় কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্ক (বেন) এবং বেনের রাজশাহী আঞ্চলিক সচিবালয় হিসেবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর) যৌথভাবে কর্মশালাটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. আকতার বানু।
কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সন্তানের বেড়ে ওঠা নিয়ে বর্তমান সময়ে প্রতিটি অভিভাবকই উদ্বিগ্ন থাকেন। আমাদের শিশুরা অধিকাংশ সময় চার দেয়ালের ভেতর বন্দি থাকায় তাদের স্বাভাবিক ও মানবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিটি পরিবার যাতে শিশুকে প্রয়োজনীয় সময় ও উপযুক্ত যত্ন দিতে পারে, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমাদের সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) টুকটুক তালুকদার বলেন, শিশুদের সুষ্ঠু বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের মাধ্যমেই শিশুর সুস্থ বিকাশ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।
কর্মশালায় বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্কের ভাইস-চেয়ার মাহমুদা আখতার শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও জাতীয় নীতিমালার ওপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর জেমস ওয়ার্ড খাকসি প্রকল্পের পটভূমি ও সামগ্রিক উদ্দেশ্য তুলে ধরেন।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর ফারাহ মুনীর।
আইইআরের সহকারী অধ্যাপক নাসরিন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় বক্তারা বলেন, প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশের মূল লক্ষ্য হলো শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, প্রারম্ভিক শিক্ষা, সুরক্ষা এবং সামাজিক ও মানসিক বিকাশকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা। জীবনের প্রথম কয়েক বছরে সঠিক যত্ন নিশ্চিত করা গেলে শিশুর ভবিষ্যৎ শিখন সক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তা আরও শক্তিশালী হয়।
আয়োজকেরা জানান, ২০২২ থেকে ২০২৬ মেয়াদে পরিচালিত ‘ক্যাটালাইজিং হোল চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের শিখনমুখী মূল্যায়ন থেকে পাওয়া তথ্য মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের পথ দেখাবে।
উন্মুক্ত আলোচনায় ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির ডেপুটি ম্যানেজার তাসনিম সরকার প্যারেন্ট-টিচার অ্যাসোসিয়েশন (পিটিএ) সংক্রান্ত গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কমিউনিটিকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
আলোচনায় সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর জাহিদুল হক খানসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধি ও শিক্ষাবিদরা অংশ নেন। এ সময় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষার ব্যবহার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাক্রম, ইতিবাচক অভিভাবকত্ব, কমিউনিটি সেন্টারের ভূমিকা এবং বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
সমাপনী বক্তব্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের অধ্যাপক ড. হ্যাপি কুমার দাস বলেন, ‘শিশুর বিকাশ কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; পরিবার, সমাজ, সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত প্রয়াসেই শিশুর জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।’
দিনব্যাপী কর্মশালায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপপরিচালক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা, প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) সুপারিনটেনডেন্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, স্থানীয় ইসিডি কমিটির সদস্য, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিনিধি এবং স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।


