
রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের মাটি কাটার কাজ করতে গিয়ে মাটির নিচে থাকা সরকারি ডিজেল সরবরাহের পাইপ ফেটে গেছে। মুহূর্তেই পাইপ দিয়ে বেরিয়ে বিপুল পরিমাণ ডিজেল পাশের ড্রেনে ছড়িয়ে পড়ায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১০ হাজার লিটার ডিজেল ড্রেনে চলে গেছে। তবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১০০ লিটার ডিজেল অপচয় হয়েছে। ফলে সরকারি সম্পদের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের ৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, স্টেশনের তেলের ডিপোতে ট্রেনের ইঞ্জিন ও পাওয়ার কারের জন্য ডিজেল সংরক্ষণ করা হয়। সেখানে থাকা একটি ট্যাংকের ধারণক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার লিটার। ৮ নম্বর প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের কাজের অংশ হিসেবে এসকেভেটর দিয়ে মাটি কাটার সময় মাটির নিচে থাকা ডিজেল সরবরাহের পাইপ কেটে যায়। এতে ট্যাংক থেকে ডিজেল বের হয়ে পাশের ড্রেনে ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন ড্রেনে নেমে বালতি ও বিভিন্ন পাত্র দিয়ে ডিজেল সংগ্রহ করতে থাকেন। কেউ কেউ ড্রামেও তেল জমা করেন। এতে ঘটনাস্থলে ভিড় জমে যায়।
রেলওয়ের এসএই এআইডব্লিউ মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘৮ নম্বর লাইনে মাটি কাটার সময় পাইপটি কেটে যায়। ঢাকার রুবেল এন্টারপ্রাইজ সেখানে কাজ করছে। খবর পাওয়ার পর চেক ভালভ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’
তবে ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট ট্যাংকে ঠিক কত লিটার ডিজেল ছিল এবং পাইপ ফেটে কতটুকু ডিজেল বেরিয়ে গেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। ফলে বিপুল পরিমাণ সরকারি জ্বালানি অপচয়ের আশঙ্কার পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, পাইপ ফেটে যাওয়ার পর বেশ কিছু সময় ধরে ডিজেল ড্রেনে প্রবাহিত হয়েছে। তাদের ধারণা, প্রায় ১০ হাজার লিটার পর্যন্ত ডিজেল বেরিয়ে যেতে পারে। যদিও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এ দাবির সঙ্গে একমত নয়।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ -মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘এটি অনাকাঙ্ক্ষিত একটি দুর্ঘটনা। প্রায় ১০০ লিটারের মতো ডিজেল অপচয় হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
তবে স্থানীয়দের দাবি ও রেলওয়ের প্রাথমিক হিসাবের মধ্যে এত বড় ব্যবধান থাকায় প্রশ্ন উঠেছে—ঘটনার সময় পাইপ দিয়ে আসলে কতক্ষণ ডিজেল বের হয়েছে, ট্যাংকে তখন কতটুকু জ্বালানি ছিল এবং কত লিটার ডিজেল ড্রেনে পড়েছে, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব কীভাবে করা হবে।
এদিকে ঘটনার কারণ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের মতো বড় নির্মাণকাজ শুরুর আগে মাটির নিচে থাকা পাইপলাইন ও অন্যান্য অবকাঠামোর অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কাজের সময় রেলওয়ের প্রকৌশলী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত তদারকি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি জ্বালানি সরবরাহের পাইপলাইন এলাকায় মাটি কাটার আগে ভূগর্ভস্থ লাইনের অবস্থান চিহ্নিত করা এবং ঠিকাদারি শ্রমিকদের সে বিষয়ে অবহিত করা জরুরি। তা না হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনায় বড় ধরনের সরকারি সম্পদের ক্ষতি হতে পারে।
অন্যদিকে ঘটনাস্থলে ছবি ও ভিডিও ধারণে গণমাধ্যমকর্মীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। আরএনবির হাবিলদার মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা দেন বলে অভিযোগ করেন উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা।
এ বিষয়ে আরএনবি পশ্চিমের চিফ কমান্ড্যান্ট আসাবুল ইসলাম বলেন, ‘সাংবাদিকদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই উচিত হয়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি নির্মাণকাজের আগে যথাযথ সমন্বয় ও তদারকির ঘাটতির কারণে ঘটেছে—তা এখন খতিয়ে দেখার বিষয়। একই সঙ্গে স্থানীয়দের দাবি করা বিপুল পরিমাণ ডিজেল এবং রেলওয়ের প্রাথমিক হিসাবে উল্লেখ করা প্রায় ১০০ লিটারের ব্যবধানও স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশের দাবি উঠেছে।


