
হাবিব আহমেদ, স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী
রাজশাহী মহানগরীর ধরমপুর এলাকার সায়রা খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাহনাজ বেগমের চাকরির বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁর নিয়োগের কোনো বৈধ নথি বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত নেই। এমনকি নিজের নিয়োগপত্রও দেখাতে পারেননি তিনি। তা সত্ত্বেও প্রায় এক দশক ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।

বিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, প্রায় দেড় দশক ধরে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও বিদ্যালয়ের তৎকালীন পরিচালনা কমিটির সভাপতির সহযোগিতায় তিনি চাকরি বহাল রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা, জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ এবং প্রশাসনিক তদন্তের দাবিও উঠেছে।
রাজশাহীর সায়রা খাতুন নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে শাহনাজ বেগমকে ঘিরে বিতর্ক; আদালতে মামলা, ডিসির কাছে অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস শিক্ষাবোর্ডের
নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে শাহনাজ বেগমও যোগ দেন। পরে ১৯৯৮ সালে সরকারি বিধি অনুসরণ করে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় প্রয়োজনীয় পদ না থাকায় শাহনাজ বেগমকে শারীরিক শিক্ষা (বিপিএড) ডিগ্রি অর্জনের পরামর্শ দেওয়া হয়। তিনি রাজশাহী সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ থেকে ডিগ্রি নিলেও পরবর্তীতে শরীরচর্চা পদ সৃষ্টি হলেও তাঁকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এমনকি তিনি ওই সনদও বিদ্যালয়ে জমা দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়োগ-সংক্রান্ত রেজুলেশন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৯৮ সালের ৫ নভেম্বর সকালে অনুষ্ঠিত নিয়োগ কমিটির সভায় শাহনাজ বেগমের নিয়োগ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ওই রেজুলেশনে পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল হান্নানসহ সদস্যদের স্বাক্ষর রয়েছে।
তবে একই দিন বিকেলে আরেকটি রেজুলেশনে শাহনাজ বেগমকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই রেজুলেশনে নিয়োগ বোর্ডের সদস্যসচিব ও তৎকালীন প্রধান শিক্ষকসহ একাধিক সদস্যের স্বাক্ষর নেই। এতে প্রশ্ন উঠেছে, সদস্যসচিবের উপস্থিতি ও স্বাক্ষর ছাড়া নিয়োগপত্র কীভাবে ইস্যু হলো।
বিদ্যালয় সূত্র জানায়, ২০১৬ সালে শাহনাজ বেগম ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, জ্যেষ্ঠ আরেক শিক্ষকের পরিবর্তে তৎকালীন পরিচালনা কমিটির সভাপতির সহায়তায় তিনি ওই দায়িত্ব নেন। অভিযোগকারীদের দাবি, সে সময় রাজশাহী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার রাজনৈতিক প্রভাবও তাঁর পক্ষে কাজ করেছে।
যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শাহনাজ বেগম বলেন, “আমার নিয়োগ বৈধ। যারা আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন, তাঁরাই বলতে পারবেন আমি বৈধ কি না।” তবে নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি।
বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক নজিবর রহমান দাবি করেন, এমপিওভুক্তির সময় সব শিক্ষক-কর্মচারীর কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও শাহনাজ বেগম বাদ পড়েন। পরে তিনি প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর জাল করে কাগজপত্র জমা দিয়ে এমপিওভুক্ত হন বলে অভিযোগ করেন নজিবর রহমান।
তিনি বলেন, “আমি তাঁর নিয়োগ ও এমপিওর কাগজপত্র চাইলে তিনি দেখাতে পারেননি। এজন্য তাঁর বেতন বিলে আমি স্বাক্ষর করিনি। পরে আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অবসরে যাওয়ার পরও সেই বরখাস্তাদেশ বহাল রয়েছে।”
নজিবর রহমান আরও দাবি করেন, শাহনাজ বেগমের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তিনি ২০১১ সালে আদালতে মামলা করেন, যা এখনও বিচারাধীন। মামলা চলমান থাকা অবস্থাতেই তাঁকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল হান্নানের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তিনি মারা গেছেন।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক শামীম হাসান বলেন, “একজন শিক্ষককে অবশ্যই বিধিমালা অনুসারে নিয়োগ পেতে হবে। নিয়োগসংক্রান্ত সব নথি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত থাকার কথা। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বর্তমান গভর্নিং বডির সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং আদালতের চলমান মামলার নিষ্পত্তির পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট হবে। তবে নিয়োগপত্র ও অন্যান্য মূল নথি নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা ইতোমধ্যে বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।


