
তৃণমূল থেকে উঠে এসেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছাত্রজীবনে ছিলেন ছাত্রনেতা, কর্মজীবনে ছিলেন শিক্ষক এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় আজ তিনি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনীতিবিদ। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুটা ছিল একটু ব্যতিক্রম। শিক্ষকতার পেশায় কম সময় কাটিয়ে তিনি রাজনীতির জীবনে পদার্পণ করেন। সাধারণ কর্মী থেকে নেতা, নেতা থেকে পৌরসভার চেয়ারম্যান, এরপর সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী এবং অবশেষে দেশের রাষ্ট্রপতি আসনে বসতে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তাঁর মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। একজন ‘সজ্জন রাজনীতিবিদ’ হিসেবে সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া মির্জা ফখরুলের এই মনোনয়ন একটি অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায়। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন আইনজীবী এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী। তাঁর মা মির্জা ফাতেমা আমিন। মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতির পাঠ শুরু করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি পুরোদমে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপের মাধ্যমে। সেখান থেকে পরবর্তীতে তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি এবং পরবর্তীতে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদে উন্নীত হন।
২০১১ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করার পর ২০১৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। রাজনীতির মাঠে তাঁর দীর্ঘ যাত্রাপথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বিশেষ করে এক-এগারোর পটপরিবর্তন থেকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সময়টাতে দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের মুখে বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রবাসে অবস্থানকালে দেশে থেকে আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে ছিলেন মির্জা ফখরুল। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তাঁকে একাধিকবার কারাবরণও করতে হয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের সময় কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তারেক রহমানের সরকারে তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাশের আসনটিই তাঁর। এর আগে ২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে জয়ী হয়েও ভোট কারচুপির প্রতিবাদে তিনি শপথ গ্রহণ করেননি, যা সংসদীয় ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। বিএনপির প্রবীণ নেতারা মনে করেন, দুর্দিনে যেভাবে তিনি দলকে আগলে রেখেছেন, তাতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর মনোনয়ন যথাযথ হয়েছে।
ব্যক্তিজীবনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ও দুই মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। তাঁর স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ সিডনিতে পোস্ট ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত এবং ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষকতা করছেন। শিক্ষাজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ধাপে তিনি মেধা ও সজ্জনতার পরিচয় দিয়ে আসছেন।


