
দুর্গাপুরে ৫৩ সেকেন্ডের ভিডিও ফেসবুকে, ‘স্বীকারোক্তি’ নেওয়ার অভিযোগ
আব্দুল্লাহ আল শামস, রাজশাহী(দূর্গাপুর) প্রতিনিধিঃ মোবাইল ফোন ও টাকা চুরির অভিযোগে ১৪ বছরের এক শিশুকে গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কথিত চুরির স্বীকারোক্তি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনার ৫৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে শিশুটিকে গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তাকে ভয় দেখিয়ে নখ কেটে দেওয়ার কথা বলতেও শোনা যায়।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকাল ১১টার দিকে রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার পানানগর ইউনিয়নের মহিপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। নির্যাতনের শিকার শিশুটির নাম রিয়াজুল ইসলাম রিফাত (১৪)। সে উপজেলার খাসখামার গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে।
গাছের সঙ্গে বাঁধা শিশুর ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একটি আমগাছের সঙ্গে রশি দিয়ে শিশুটিকে বেঁধে রাখা হয়েছে। এ সময় কয়েকজন তাকে মোবাইল ফোন চুরির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। শিশুটিকে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। ভিডিওর একপর্যায়ে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নখ কেটে দেওয়ার কথা বলতেও শোনা যায়।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং শিশুটিকে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
‘সকাল ৮টায় নিয়ে যায়, ১১টায় বাড়িতে দিয়ে যায়’
শিশুটির বাবা আনোয়ার হোসেনের দাবি, রিফাত মহিপাড়া গ্রামে তার নানির বাড়িতে থাকত। প্রায় ২০ দিন আগে একটি মোবাইল ফোন ও ৯০০ টাকা নিয়ে সে ঢাকায় চলে যায়। পরে প্রায় পাঁচ দিন আগে ঢাকা থেকে বাড়িতে ফিরে আসে।
আনোয়ার হোসেন বলেন, শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে মহিপাড়া গ্রামের বাবু হোসেনসহ কয়েকজন রিফাতকে নিয়ে যান। পরে বেলা ১১টার দিকে তাকে বাড়িতে দিয়ে যান। এরপর তিনি জানতে পারেন, তার ছেলেকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।
তার দাবি, মোবাইল ফোন ও টাকা চুরির বিষয়ে শিশুটির কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে।

তবে শিশুটির বিরুদ্ধে ওঠা চুরির অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আগেও চুরির অভিযোগ, তবে হয়নি আইনগত ব্যবস্থা
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রিফাতের বিরুদ্ধে এলাকায় এর আগেও ছোটখাটো চুরির অভিযোগ উঠেছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা জানান, রিফাতের বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছে অনেক আগেই। পরে দুজনই অন্যত্র বিয়ে করে নতুন সংসার শুরু করেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই অনেকটা অভিভাবকহীন অবস্থায় তার বেড়ে ওঠা। পারিবারিক অস্থিরতা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই তার জীবন কাটছে বলে জানান তারা।
তবে পারিবারিক পরিস্থিতি কিংবা কোনো চুরির অভিযোগই একটি শিশুকে আটক করে শারীরিক বা মানসিকভাবে নির্যাতনের বৈধতা দেয় না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ উঠলে তার সত্যতা যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের নামে একজন শিশুকে গাছের সঙ্গে বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ, মারধর বা ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ তাই গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে ঘটনাটির ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় শিশুটির নিরাপত্তা, মানসিক ক্ষতি ও ব্যক্তিগত মর্যাদা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তদন্তে পুলিশ
ঘটনার খবর পেয়ে দুর্গাপুর থানা পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে।
দুর্গাপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শ্রী পঞ্চানন্দ সরকার বলেন, ‘ঘটনাটি জানার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পরে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রিফাতের বয়স সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি বলেন, তার বয়স ১৩ থেকে ১৪ বছর হতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ, শিশুটির বিরুদ্ধে ওঠা চুরির অভিযোগের সত্যতা এবং তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনায় কারা জড়িত—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রিফাতের বাবা আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য পাওয়া গেলেও অভিযুক্ত হিসেবে যাদের নাম স্থানীয়ভাবে এসেছে, তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


