
হর্ন-অটোরিকশায় অতিষ্ঠ নগরী
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অসংখ্য হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘিরে নগরীর লক্ষ্মীপুর মোড়। প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে এখানে আসেন হাজারো রোগী ও স্বজন। অথচ রোগীদের জন্য অপেক্ষাকৃত শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ থাকার কথা থাকলেও এই এলাকাতেই শব্দদূষণের মাত্রা উঠেছে ১০২ দশমিক ৬ ডেসিবেলে। অনুমোদিত সীমার তুলনায় ভয়াবহ মাত্রার এই শব্দদূষণ অসুস্থ মানুষ, বয়স্ক ও শিশুদের জন্য তৈরি করছে বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি।

একই সঙ্গে হর্ন-অটোরিকশায় অতিষ্ঠ জনজীবন। নগরায়ন ও যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে রাজশাহী নগরীতে শব্দদূষণও ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। নগরীর ব্যস্ততম দুই এলাকা রেলগেট ও লক্ষ্মীপুর মোড়ে শব্দমাত্রা পরিমাপ করে সর্বোচ্চ গড় ১০০ ডেসিবেলের বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রেলগেটে ১০১ দশমিক ৫ এবং লক্ষ্মীপুর মোড়ে ১০২ দশমিক ৬ ডেসিবেল শব্দমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। অথচ এসব এলাকায় অনুমোদিত শব্দমাত্রা এর চেয়ে অনেক কম।
গতকাল শনিবার সকালে রেলগেটে এবং লক্ষ্মীপুর মোড়ে একটি জরিপ পরিমাপ করা হয়। বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এবং বারিন্দ এনভায়রনমেন্টের সহযোগিতায় এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরিমাপের নেতৃত্ব দেন ড. প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন খান। তাকে সহযোগিতা করেন ড. অলি আহমেদ, শামসুর রাহমান শরীফ, মো. ওবায়দুল্লাহ, রুমানা আহমেদ, ইফাত আরা, কলি আহমেদ, আবু তারেক বিন আজিজ, রুহুল হাসান পলাশসহ সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবীরা।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে একই স্থান ও প্রায় একই সময়ে রাজশাহী নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ধারাবাহিকভাবে শব্দমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। গত বছর রেলগেট ও লক্ষ্মীপুর মোড়ে সর্বোচ্চ গড় শব্দমাত্রা ছিল প্রায় ৯৭ ডেসিবেল। এক বছরের ব্যবধানে দুই এলাকাতেই শব্দদূষণের মাত্রা আরও বেড়েছে।
ড. প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন খান কালবেলাকে জানান, বাংলাদেশের শব্দদূষণ বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী শব্দমাত্রার ভিত্তিতে এলাকাকে নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প—এই পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। দিনের বেলায় বাণিজ্যিক এলাকায় অনুমোদিত শব্দমাত্রা ৭০ ডেসিবেল এবং নীরব এলাকায় সর্বোচ্চ ৫০ ডেসিবেল। তিনি আরও বলেন, রেলগেট বাণিজ্যিক এলাকার অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকেন্দ্রিক হওয়ায় লক্ষ্মীপুর মোড় নীরব এলাকার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে। ফলে সেখানে পাওয়া ১০২ দশমিক ৬ ডেসিবেল শব্দমাত্রা অনুমোদিত সীমার তুলনায় অত্যন্ত বেশি।
শব্দদূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানোর প্রবণতাকে দায়ী করেন তিনি। পাশাপাশি হর্ন নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেন। তার ভাষ্য, শব্দদূষণ শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ নয়, এটি জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি তৈরি করছে।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) প্রকাশিত ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি এবং রাজশাহীকে চতুর্থ সর্বাধিক শব্দদূষিত শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে রাজশাহীতে শব্দমাত্রা প্রায় ১০৩ ডেসিবেল বলে উল্লেখ করা হয়। এবার মাঠপর্যায়ের পরিমাপেও নগরীতে শব্দদূষণের ভয়াবহ মাত্রার চিত্র উঠে এসেছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে শব্দদূষণের মাত্রা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতে লিফলেট বিতরণ, সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও মানববন্ধন করা হচ্ছে।
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে রাজশাহী সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, চালক ও নগরবাসীকে সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। বিশেষ করে হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনবহুল এলাকায় ‘অপ্রয়োজনে হর্ন নয়’নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ কালবেলাকে জানান, হাসপাতাল ও এর আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত শব্দদূষণ রোগীদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভোগের কারণ। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ রোগী, শিশু, বয়স্ক ও অস্ত্রোপচার-পরবর্তী রোগীদের জন্য অতিরিক্ত শব্দ শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। হাসপাতালের আশপাশে অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো ও উচ্চ শব্দ পরিহার করা জরুরি। রোগীদের চিকিৎসাসেবার স্বার্থে হাসপাতালকেন্দ্রিক এলাকায় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে চালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ বনি আহসান কালবেলাকে বলেন, শব্দদূষণ রোধে অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো বন্ধসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রেলগেট ও লক্ষ্মীপুর জনবহুল হওয়ায় যানবাহনের চাপ ও যানজট বেশি থাকে। ফলে শব্দদূষণ ও জনদুর্ভোগ বাড়ে। যানজট কমানো, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদারের মাধ্যমে শব্দদূষণ কমাতে আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজশাহী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছাঃ তাছমিনা খাতুন কালবেলাকে বলেন, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকেন্দ্রিক লক্ষ্মীপুরে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। পাশাপাশি শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আইন মেনে চলার পাশাপাশি নগরবাসীকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) নূর আলম সিদ্দিকী কালবেলাকে বলেন, শব্দদূষণও যে একটি মারাত্মক দূষণ এবং এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এ বিষয়ে অনেকেরই সচেতনতা নেই। অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানো বন্ধ করতে চালকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। সম্মিলিত সচেতনতাই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। তবে শব্দদূষণের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর সঙ্গে মানবিক বিষয়টিও জড়িত—হাসপাতাল এলাকায় রোগী ও স্বজনদের কথা বিবেচনা করে সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হয়। জনসচেতনতা বাড়ানো এবং প্রচলিত আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের মাধ্যমেই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।


